কি দোষ ছিল অবুঝ শিশু মুসলিমার?

কি দোষ ছিল অবুঝ শিশু মুসলিমার?

স্ফুলিঙ্গ ডেক্স  :

বয়স মাত্র ২৫ মাস। পৃথিবীর জটিলতা বোঝার ক্ষমতা এখনো হয়নি ছোট্ট মুসলিমার। অথচ এই অল্প বয়সেই তার জীবনের আকাশ থেকে একে একে খসে পড়েছে সব নির্ভরতার তারা। জন্মের ২১ দিনের মাথায় মা তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দূরে; আর গত শুক্রবার এক পৈশাচিক ‘গুজবের’ বলি হয়ে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন বাবা হান্নান শেখ। ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর গ্রামের এই শিশুটি এখন কেবলই এক দিশেহারা এতিম মুখ।

হাসি-খেলার বয়সে এতিম হওয়ার আর্তনাদ

​শনিবার বিকেলে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক বুকফাটা হাহাকার। স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও শিশু মুসলিমা নির্বাক। কখনো দাদির কোলে মুখ লুকাচ্ছে, কখনো আগন্তুকদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বাবাকে খুঁজছে। মা চলে যাওয়ার পর দাদি নার্গিস বেগমই তাকে মায়ের মমতায় আগলে রাখছিলেন। বিলাপ করতে করতে দাদি বলছিলেন, “মা ২১ দিনেই ফেলে গেছে, এখন বাপডাও চলি গেল। আমার মুসলিমার দুনিয়াতে আর কেউ রইল না রে!”

একটি মৃত্যু, হাজারো প্রশ্ন: আইনের চেয়ে কি গুজব বড়?

​ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার রাতে নগরকান্দার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায়। একটি নিছক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুহূর্তেই গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, হান্নানের ট্রাক ২০ জনকে চাপা দিয়েছে। উন্মত্ত জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ট্রাক থামিয়ে হান্নানকে (৪৫) নামিয়ে বর্বরভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। অথচ পরিবারের দাবি, হান্নান ছিলেন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অপরাধ করলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া যেত, কিন্তু কেন তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো—এই প্রশ্ন এখন শোকাতুর বাবার।

অনিশ্চিত গন্তব্য: মুসলিমার ভবিষ্যৎ কী?

​বৃদ্ধ দাদা-দাদির সংসারে এখন কেবল অভাব আর শোকের ছায়া। যারা তাকে বড় করবেন, তাদের নিজেদেরই চলার শক্তি ফুরিয়ে এসেছে। স্থানীয়রা বলছেন, বেপরোয়া গতির অভিযোগ থাকলেও এভাবে পিটিয়ে মানুষ মারা কোনো সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না। মা-বাবাহীন এই শিশুর দায়িত্ব এখন সমাজ ও রাষ্ট্রের।

​সচেতন মহলের দাবি, গুজবে বিশ্বাস করে যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ছোট্ট মুসলিমার পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠার জন্য সরকারি ও সামাজিক সহায়তা জরুরি।

শেষ কথা: মুসলিমা হয়তো এখনো জানে না, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। ফিডারে দুধ খেতে খেতে হঠাৎ গুমরে কেঁদে ওঠা শিশুটি কি বুঝতে পারছে—মানুষের এক পাক্ষিক প্রতিহিংসা তার জীবন থেকে চিরতরে মুছে দিয়েছে বাবার শেষ আশ্রয়টুকু?

ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *