মোঃ মাসুদ রানা,কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি :
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ-গান্না সড়কের বিভিন্ন স্থানে সচল ও ভালো মানের পিচঢালা সড়ক কেটে হঠাৎ করে ইটের সলিং নির্মাণের কাজ চলায় স্থানীয় জনগণের মনে নানা প্রশ্ন ও তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সাধারণ মেরামত বা প্যাচিং না করে সম্পূর্ণ ভালো অবস্থায় থাকা সরকারি পাকা সড়ক খুঁড়ে এই কাজ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন চলাচলকারী পথচারী ও চালকেরা। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অর্থায়নে ও আওতায় প্রায় সাড়ে ৮০০ মিটার সড়কে দুই স্তরের এই ইটের সলিং নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৮ লাখ টাকা। স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকেই সরকারের এই প্রকল্পটিকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং অস্বাভাবিক ও কাল্পনিক ব্যয়ের একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
সরেজমিনে মেঠোপথ ও এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে শুরু করে আলাইপুর পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সচল পিচের স্তর কেটে সেখানে জোরপূর্বক দুই স্তরের ইট বসানোর কাজ চলছে। নিয়মিত চলাচলকারী পথচারী ও স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট দাবি, সড়কের মাত্র কয়েকটি স্থান সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অধিকাংশ স্থানই অত্যন্ত ভালো ও সচল অবস্থায় ছিল; অথচ সেগুলো সংস্কারের নামে ঠিকাদারের মাধ্যমে পাকা সড়ক কেটে ইটের সলিং নির্মাণ করে জনভোগান্তি বাড়ানো হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সরাসরি অভিযোগ, এই অদ্ভুত ও খামখেয়ালি কাজের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ভাবে অপচয় করা হচ্ছে। বিতর্কিত এই প্রকল্পটির মাঠপর্যায়ের কাজ করছে ঝিনাইদহের স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘গামা কনস্ট্রাকশন’। সড়কসংলগ্ন ধান ব্যবসায়ী তুহিন হোসেন অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সড়কের কয়েকটি স্থানে সামান্য ক্ষতি হয়েছিল, যা সামান্য পিচ-পাথর দিয়ে ভরাট বা প্যাচিং করেই সহজে মেরামত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তা না করে প্রায় এক মাস ধরে ভালো পিচঢালা সড়ক কেটে নতুন করে খানাখন্দের মতো ইটের সলিং বসানো হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চালকদের নিত্যদিনের ভোগান্তি কেবল বেড়েই চলেছে। একই পথের নিয়মিত ইজিবাইক চালক আলিম হোসেন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ভালো রাস্তা কেটে নতুন করে ইট বসানো মানেই তো স্পষ্ট সরকারি টাকার অপচয়। সামান্য মেরামত করলেই যেখানে সড়কটি পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য থাকত, সেখানে এই কাজের কোনো মানে হয় না। তিনি আরও যোগ করেন, আমরা লোকমুখে শুনেছি আগামী এক বছরের মধ্যেই প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিশাল ব্যয়ে এই পুরো সড়কের স্থায়ী বৃহৎ উন্নয়ন ও প্রসারণ কাজ শুরু হবে; তাহলে এখন তড়িঘড়ি করে এতগুলো লাখ টাকা ব্যয় করে ইটের সলিং করার পেছনে আসল যৌক্তিকতা ও রহস্য কোথায়?
এই চাঞ্চল্যকর অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে গামা কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী গোলাম মেম্বার নিজের দায় এড়িয়ে জানান, তিনি সরকারি টেন্ডার বা দরপত্রের নিয়ম ও শর্ত অনুযায়ী কাজ করছেন। টেন্ডার প্রকল্পে যেসব সুনির্দিষ্ট স্থানে ইটের সলিং করার নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে, ঠিক সে সব স্থানেই শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এই কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, কালীগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) অপূর্ব বিশ্বাস এই কাজের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে দাবি করেন, বিগত বর্ষার পানিতে সড়কের বিভিন্ন নিচু অংশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সাময়িকভাবে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল এবং এটি মূলত সওজ’র নিয়মিত সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমেরই একটি অংশ। তবে, সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত ভালো অবস্থায় থাকা সচল সড়ক কেটে কেন নতুন করে ইটের সলিং নির্মাণ করা হচ্ছে—সাংবাদিকদের এমন সুনির্দিষ্ট ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পরামর্শ দিয়ে নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। ছবি সংগৃহীত।

