স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার নেপা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাখিলা বইয়ের পাতা ছিঁড়ে সরকারি নথিপত্র আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অকাট্য অভিযোগে ওই অফিসের সাবেক অফিস সহায়ক রেজাউল হক ভাস্করকে বিভিন্ন ধারায় সর্বমোট ২৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন ২০২৬) যশোরের বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক ও জেলা জজ এস এম নূরুল ইসলাম জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) সিরাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকর্মীদের নিকট রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত কুখ্যাত অপরাধী রেজাউল হক ভাস্কর ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পান্তাপাড়া গ্রামের আব্দুল হকের ছেলে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, রায় ঘোষণার নির্ধারিত সময়ে আসামি ভাস্কর আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। পূর্বে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই তিনি স্থায়ীভাবে আত্মগোপন ও পলাতক রয়েছেন।
আদালতে উপস্থাপিত মামলার এজাহার ও নথির বিবরণ থেকে জানা যায়, সাজাপ্রাপ্ত রেজাউল হক ভাস্কর মহেশপুরের নেপা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অফিস সহায়ক (পিয়ন) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর অফিসে ব্যবহৃত ‘৭৫/২০১৬-১৭’ নম্বরযুক্ত অফিশিয়াল দাখিলা বই থেকে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে ও কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন সিরিয়ালের মোট আটটি মূল পাতা গোপনে ছিঁড়ে নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়। একই বছরের ২৯ নভেম্বর আকস্মিকভাবে দাখিলা বই পরীক্ষা করতে গিয়ে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চোখে এই মারাত্মক জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে।
পরবর্তীতে ঘটনার তদন্তে অফিসের কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে একপর্যায়ে ভাস্কর নিজে দাখিলা বইয়ের পাতা ছিঁড়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর সত্যতা স্বীকার করেন। এরপর মহেশপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে ভাস্করের নিজ বাড়িতে এক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে তাঁর বাড়ি থেকে জালিয়াতি করা কয়েকটি দাখিলার মূল কপি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া অফিসের ভেতরে তাঁর ব্যবহৃত ব্যক্তিগত কক্ষ থেকে দুইটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ডি.সি.আর কপি, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে অবৈধভাবে তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ সিলমোহর এবং নগদ অর্থ উদ্ধার ও জব্দ করা হয়।
এই চরম জালিয়াতি ও সরকারি নথি চুরির ঘটনায় নেপা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাহান আলী বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তৎকালীন সহকারী পরিচালক রিজিয়া খাতুন। তিনি দীর্ঘ ও নিখুঁত তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ সরকারি অর্থ ও নথি আত্মসাতের দায়ে রেজাউল হক ভাস্করের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরবর্তীতে মামলাটি অধিকতর আইনি বিচারের স্বার্থে যশোরের বিশেষ জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়।
আদালতে দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আসামির বিরুদ্ধে আনা রাষ্ট্রীয় নথি জালিয়াতি ও চুরির অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিজ্ঞ বিচারক বিভিন্ন ধারায় মোট ২৯ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করেন। তবে আদালত তাঁর রায়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, আসামির সব সাজা আইনানুযায়ী একসঙ্গেই কার্যকর করা হবে।
আদালতের দেওয়া রায় অনুযায়ী, দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় ২ বছর, ৪৬৭ ধারায় ১০ বছর, ৪৬৮ ধারায় ৩ বছর, ২০১ ধারায় ৩ বছর এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ২০৪, ৪৭১, ৪৮৫ ও ৪৮৮ ধারায় আরও ২ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং বিভিন্ন অঙ্কের আর্থিক জরিমানা অনাদায়ে অতিরিক্ত মেয়াদে কারাদণ্ডের কঠোর আদেশ দেন আদালত। পলাতক আসামিকে গ্রেফতারে ইতোমধ্যে আদালত থেকে বিশেষ পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ফাইল ছবি সংগৃহীত।

