স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
লোহার শলাকা আর চুন খসতে থাকা উঁচু প্রাচীরের ওপারে যেখানে একসময় কেবলই অন্ধকারের শাসন চলতো, সেখানে আজ পরিবর্তনের এক নতুন ভোরের উদয় হয়েছে। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার—দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই বিশাল বন্দিশালায় দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা অনিয়ম, দুর্নীতি আর মাদক বাণিজ্যের অভিশপ্ত দেওয়ালগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। যে কারাপ্রাঙ্গণ একসময় দুর্গন্ধযুক্ত অখাদ্য আর মাদক সিন্ডিকেটের চারণভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল, বর্তমান আইজি প্রিজন্স ও স্থানীয় কারা প্রশাসনের আপসহীন মনোভাবের কারণে তা আজ এক সত্যিকারের ‘সংশোধনাগারে’ রূপান্তরিত হয়েছে। তবে আলোর এই উজ্জ্বল রশ্মিতে মুখ অন্ধকার হয়ে গেছে বছরের পর বছর ধরে বন্দিদের রক্ত চোষা কতিপয় অসাধু ঠিকাদার ও কারাগারের ভেতরে বিষ ছড়ানো কিছু লোভী কারারক্ষীর।
কারাগারের অন্দরের খবর নিতে গিয়ে জানা যায়, অতীতে একশ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ সন্তুষ্ট করে চিহ্নিত কিছু ঠিকাদার জেলের ভেতরে পচা, নিম্নমানের ও মানুষের খাওয়ার অযোগ্য শাকসবজি, মাছ ও মুরগি সরবরাহ করতো। নিরুপায় বন্দিরা সেই অখাদ্য মুখে তুলতে না পেরে পকেটের টাকা খসিয়ে জেলের ভেতরের ক্যান্টিনগুলোর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হতো। ফলে বন্দিদের হাহাকারে ভারী হতো জেলের বাতাস, আর পকেট ভারী হতো অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের।
কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি সেই রমরমা কালো বাণিজ্যে কুঠারাঘাত করেছে। এখন আর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই; স্বয়ং আইজি অফিস থেকে সরাসরি লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে প্রতিদিন জেলের ভেতরের কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্যের গুণগত মান তদারকি করা হচ্ছে। ফলে, বন্দিরা এখন নিয়মিত খাওয়ার উপযোগী ভাত, তরকারি, টাটকা মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ পাচ্ছেন। প্রধান খাবারের মান আকাশচুম্বী হওয়ায় বন্দিরা এখন আর ক্যান্টিনমুখী হচ্ছেন না, যার কারণে জেলের ভেতরের ক্যান্টিনগুলোর বেচাকেনায় একপ্রকার মন্দাভাব বিরাজ করছে।। শুধু তাই নয়, বন্দি ও তাঁদের স্বজনদের পকেট কাটা রুখতে ক্যান্টিনের প্রতিটি পণ্যের সরকারি মূল্যতালিকা জেলের ভেতরে এবং বাইরের প্রধান ফটকে বড় বড় বোর্ডে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা কারা ইতিহাসে এক বিরল স্বচ্ছতার নজির।
সম্প্রতি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হওয়া বাঘারপাড়া, মণিরামপুর ও শার্শা উপজেলার তিন ব্যক্তি কারাগারের ভেতরের এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনের চোখ জুড়ানো বর্ণনা দিয়েছেন। বাঘারপাড়ার জাহিদুল ইসলাম (৩৪) তাঁর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “ভাই, বছর তিনেক আগেও একটা জমিজমা সংক্রান্ত মামলায় জেলের ভাত খেয়েছিলাম। সেই সময় ভাত আর গন্ধযুক্ত ডালের যে দশা ছিল, তা মনে করলে এখনো গা শিউরে ওঠে। বাধ্য হয়ে বাড়ি থেকে টাকা আনিয়ে ক্যান্টিন থেকে চড়া দামে কিনে খেতাম। এবার সেই মামলায় জামিন বাতিল হওয়ায় আবার জেলে যেতে হয়েছে আমাকে। প্রবেশ করার আগে ভেবেছিলাম,এবারও মনে হয় ক্যান্টিনমুখী হওয়া লাগবে। এজন্য বাড়ির লোকজনকে বলেছিলাম, পিসিতে টাকা দিতে। কিন্তু ভেতরে ঢুকে আমার চোখ চড়কগাছ! জেলের ভাত-তরকারি এখন এতটাই পরিষ্কার ও সুস্বাদু যে, এবার ১০ দিনের পুরোটা সময় জেলের খাবারই খেয়েছি। চা-বিস্কুট ছাড়া ক্যান্টিন থেকে এক টাকারও বাড়তি খাবার আমার কেনা লাগেনি। কারাগারের খাবার যে এত ভালো হতে পারে, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।”
মণিরামপুরের আশরাফুল আরিফ (৩৮) তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, “আগেরবার যখন জেলে এসেছিলাম, তখন চোর-ডাকাতদের চেয়েও বেশি ভয় লাগত কিছু অসাধু কারারক্ষীকে। তারা বাইরে থেকে লুকিয়ে মাদক এনে ভেতরে চড়া দামে বেচতো এবং পুরো ওয়ার্ডে গাঁজা ও ইয়াবার গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসত। আর এবার দেখলাম, সেই গাঁজা ও ইয়াবার গন্ধও উধাও। আসামি ও কারারক্ষীদের ঢোকার পর প্রধান ফটকেই যেভাবে চিরুনি তল্লাশি চালানো হচ্ছে, তাতে সুঁই গলানোরও উপায় নেই। ভেতরের ওয়ার্ডগুলোতেও প্রতিনিয়ত ঝটিকা অভিযান চলছে। কারাগারের পরিবেশ এখন এতটাই শান্ত ও পরিচ্ছন্ন যে, জেলের ভেতরে মাদক সাপ্লাই দেওয়া সেই অসাধু রক্ষীদের মাথায় এখন হাত পড়েছে।”
শার্শা উপজেলার সীমান্ত এলাকার যুবক কামরুল হাসান (২৯) বলেন, “আমি খুব অবাক হয়েছি জেলের ভেতরের বর্তমান পরিবেশ দেখে। আগে মানুষ জেলে গিয়ে আরও বড় অপরাধী হয়ে বের হতো। আর এখন বর্তমান কর্মকর্তারা আমাদের মতো বন্দিদের মানসিক অবসাদ দূর করতে প্রতিদিন বিকেলে ভলিবল, ফুটবলের মতো খেলাধুলার ব্যবস্থা করেন। এমনকি ভেতরে গান-বাজনার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। আর যারা মাদকাসক্ত, তাদের আলাদা করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য ওয়ার্ডের শিক্ষিত রাইটারদের দিয়ে কাউন্সিলিংও করানো হচ্ছে।। জেলের ভেতরের এই রূপান্তর সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।”
সূত্র জানিয়েছে, হঠাৎ করে আয়ের অবৈধ উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদার ও অপকর্মে লিপ্ত কতিপয় কারারক্ষী চক্র বর্তমান প্রশাসনের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। জানাগেছে, চিহ্নিত কতিপয় অসাধু ঠিকাদাররা স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে নানা কৌশলে জেলের ভেতর নিম্নমানের খাদ্যসামগ্রী ঢোকানোর অপচেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে বর্তমানে আসামিদের কপালে জুটছে ভাল মানের খাদ্য। কারা কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা—বন্দিদের হকের টাকায় কোনো ধরনের ভাগ বসাতে দেওয়া হবে না।
বর্তমানে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার পর কারাগারকে শতভাগ অপরাধমুক্ত রাখতে কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দিনরাত এক করে কাজ করছেন। একদিকে যেমন চলছে কঠোর নিরাপত্তা, অন্যদিকে বন্দিদের মানবিক বিকাশে নেওয়া হয়েছে এক ঝাঁক ইতিবাচক উদ্যোগ।
যশোরের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছেন, আইজি প্রিজন্সের আধুনিক দূরদর্শিতা এবং যশোর কারা প্রশাসনের এই আপসহীন সততা যদি ধরে রাখা যায়, তবে দেশের বাকি কারাগারগুলোর অন্ধকূপ থেকে আলোর পথে ফেরার জন্য যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার একটি অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ছবি সংগৃহীত।

