স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারণে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের বিতর্কিত ও দুর্ধর্ষ নেতাকর্মীদের নতুন করে উজ্জীবিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে চিহ্নিত ক্যাডার ও নাশকতাকারী আলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে। চতুর এই ক্যাডার লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতে দিনের বেলা সাধারণ কৃষি কাজ করলেও রাত নামলেই সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের দোসর এবং পলাতক আওয়ামী নেতাকর্মীদের জড়ো করে অতি গোপনে নাশকতার নীল নকশা ও ছক আঁকছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা।
অভিযুক্ত আলাল উদ্দিন ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারণ ইউনিয়নের রঘুনাথপুর ডাঙ্গী গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে। সে ঝিকরগাছা উপজেলা পরিষদের সাবেক বিতর্কিত চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মনিরুল ইসলামের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও পোষ্য ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়রা জানান, বিগত ২০২৪ সালের ২৫ মে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এই আলাল উদ্দিন প্রায় ৫০০ সশস্ত্র ক্যাডার সাথে নিয়ে মনিরুল ইসলামকে এলাকায় মহড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করে এবং বিশাল মোটরসাইকেল শোডাউন দিয়ে পুরো এলাকায় ভয়ঙ্কর আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সে সময় তার বাড়িতে ক্যাডারদের আপ্যায়নের জন্য ১০ হাঁড়ি খেচুড়ি রান্নার রাজকীয় আয়োজন করা হয়েছিল বলে গ্রামবাসীরা জানান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে আলাল উদ্দিন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ ক্ষমতার অপব্যবহার করে এলাকায় বিএনপিপন্থি নিরীহ লোকজনকে নিয়মিত হয়রানি, মিথ্যা মামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আসছিল। আলাল উদ্দিন, তার খালাতো ভাই নাভারণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও দুর্ধর্ষ ক্যাডার কাশেম শিকদার এবং তার আপন মামা আবুল কালামের যৌথ অত্যাচারে সে সময় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা এলাকা ছেড়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। ওই সময় রঘুনাথপুর ডাঙ্গী গ্রামের আব্দুল সাত্তারের ছেলে সক্রিয় বিএনপি কর্মী মুছা ও শাহিনকে সম্পূর্ণ বানোয়াট নাশকতা মামলা দিয়ে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিয়েছিল এই আলাল। শুধু তাই নয়, যেকোনো তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে জোরপূর্বক সালিশ-বৈঠক বসিয়ে তারা বিএনপিপন্থি লোকদের কাছ থেকে জরিমানার নামে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করত। সে সময় একটি অতি সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সালিশ বসিয়ে রঘুনাথপুর ডাঙ্গী গ্রামের চাঁদ মিয়াকে অন্যায়ভাবে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে আলাল উদ্দিনের মামা আবুল কালাম। সেই জরিমানার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে একদিন গভীর রাতে চাঁদ মিয়ার বাড়িতে আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারী ক্যাডার পাঠিয়ে তার বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় এবং অস্ত্রধারীরা সরাসরি বলে যায় যে, আলাল উদ্দিনের মামা আবুল কালামই তাদের পাঠিয়েছে।
গত ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে গণপিটুনির ভয়ে আলাল উদ্দিন, কাশেম শিকদার, আবুল কালাম ও তাদের সহযোগীরা দীর্ঘদিন পলাতক ছিল। কিন্তু সম্প্রতি নির্বাচনের পর তারা আবারও বহাল তবিয়তে এলাকায় অবস্থান করা শুরু করেছে। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, চলতি মাসেও আওয়ামী ক্যাডার আলাল উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করতে তার ডেরায় গিয়ে এক অদৃশ্য কারণে শূন্য হাতে ফিরে যায় ঝিকরগাছা থানা পুলিশ। এর আগের মাসেও আরেক কুখ্যাত ক্যাডার কাশেম শিকদারের বাড়িতে একাধিকবার নামকাওয়াস্তে অভিযান চালালেও পুলিশ তাকে রহস্যজনক কারণে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের কিছু অসৎ ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তার সাথে এই মাদক ও অস্ত্রধারী চক্রের গভীর যোগাযোগ থাকায় তারা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশের এই রহস্যজনক নীরব ভূমিকার কারণে আলাল প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং রাতে অতি গোপনে কাশেম শিকদার ও আবুল কালামসহ নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীদের সংগঠিত করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিরোধী নাশকতার বড় ছক আঁকছে, যা নিয়ে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগেও ক্যাডার আলাল উদ্দিন, তার খালাতো ভাই কাশেম শিকদার ও মামা আবুল কালামকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় শীর্ষ সংবাদমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও অদৃশ্য সুতোর টানে পুলিশ তাদের ছুঁয়েও দেখছে না, যা নিয়ে চারিদিকে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। স্থানীয় বাসিন্দা ইসমাইল আলী জানান, “সন্ধ্যার পর থেকেই আলাল উদ্দিনের বাড়িতে অপরিচিত ও সন্দেহভাজন লোকজনের আনাগোনা বাড়ে এবং গভীর রাত পর্যন্ত ঘরের লাইট বন্ধ করে মিটিং চলতে দেখা যায়। আলাল ও তার সশস্ত্র সহযোগীদের ভয়ে আমরা সাধারণ মানুষ মুখ খোলার সাহস পাই না।”
এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নাভারণ ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক হায়দার আলী বলেন, “আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যদি আবারও এই স্বাধীন দেশে বা এলাকায় কোনো ধরনের নাশকতার বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা করে, তবে আমরা সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিকভাবে তাদের কঠোর হস্তে প্রতিহত করব। কোনোভাবেই এলাকায় সরকার বিরোধী বা জননিরাপত্তা বিঘ্নিতকারী কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া হবে না।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো ধরনের অনুশোচনা ছাড়াই ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ ক্যাডার আলাল উদ্দিন বলে, “আমরা জন্মসূত্রেই আওয়ামী লীগ পরিবার, কারণে-অকারণে আমাদের দলের পক্ষে মাঠে থাকতেই হবে। যাঁরা প্রকৃত আওয়ামী লীগ করে তাঁরা কখনও কাউকে ভয় পায় না। আমার নেত্রী এখনও শেখ হাসিনাই আছেন।”
এদিকে, আলাল উদ্দিনকে এত কিছুর পরও কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না—এমন প্রশ্নে কিছুটা নীরবতা পালন করে ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়া বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আলাল উদ্দিনসহ সকল চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত সুনির্দিষ্ট ধারায় কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ও অপরাধ দমনে পুলিশের এ ধরনের বিশেষ চিরুনি অভিযান অব্যাহত আছে।”ছবি সংগৃহীত।


