স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
চট্টগ্রামজুড়ে যার নামে কাঁপত ব্যবসায়ী মহল, সেই আলোচিত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’ এবং তার তিন সহযোগী যশোরে ধরা পড়ার পর বেরিয়ে আসছে নিত্যনতুন ও চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। ভারত সীমান্তে আত্মগোপনে যাওয়ার আগেই যশোর জেলা পুলিশের যৌথ জালে আটকা পড়ে এই গ্যাংস্টার। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের চট্টগ্রাম পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হলেও, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ এবং বিভিন্ন বার্তা বিশ্লেষণে এই অপরাধ সিন্ডিকেটের এমন কিছু গোপন ছক উন্মোচিত হচ্ছে যা এতদিন ধোঁয়াশাতেই থেকে গিয়েছিল।
এনক্রিপ্টেড অ্যাপে ‘ভার্চুয়াল’ সন্ত্রাস ও আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক
ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের সাধারণ এক যুবক থেকে চট্টগ্রামের কুখ্যাত ‘সাজ্জাদ গ্রুপ’-এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হয়ে ওঠার গল্পটা রূপকথার মতো মনে হলেও তা অত্যন্ত নিখুঁত অপরাধী ছকে নির্মিত। পুলিশের বিশেষ গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করছে—এমন এক ছদ্মবেশ বা ‘কভার’ তৈরি করে রেখেছিলেন। তিনি হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল ও টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড কলিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে চট্টগ্রাম শহরের নামীদামী ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কাছে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করতেন। তিনি দাবি করতেন বিদেশ থেকে ফোন দিচ্ছেন, অথচ বাস্তবে দেশে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে এসব নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। চট্টগ্রাম ছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অন্তত ৮টি হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলার রেকর্ড রয়েছে।
চকবাজারের সেই তাণ্ডব ও সিডিআর এনালিসিস
সম্প্রতি চট্টগ্রামের চকবাজারের একটি নামী ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে (ডিডিএন) এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে হামলা ও ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ঘটনার সময় সিসিটিভি ফুটেজে ডেভিড ইমনের সরাসরি ইন্ধন স্পষ্ট ছিল। পুলিশ প্রযুক্তিগত সহায়তায় তাঁর সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ডস) ও টাওয়ার লোকেশন এনালাইসিস করে দেখতে পায়, চট্টগ্রাম ছেড়ে তিনি একটি সুরক্ষিত রুট ব্যবহার করে সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।
ঢাকার ৩ সহযোগীর সংযোগ ও সীমান্তের গোপন রুট
সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্য তৈরি করেছে ইমনের সাথে গ্রেফতার হওয়া তাঁর তিন সঙ্গীর পরিচয়। ঢাকার শ্যামপুরের আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫), কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের শামীম (২৮) এবং নোয়াখালীর সাফায়েত হোসেন (২৮) শুধুমাত্র ইমনের সহযোগীই নন, বরং তারা ছিলেন ইমনের লজিস্টিক ও সেফহাউজ ব্যবস্থাপক। প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে আসছে, সীমান্ত পার করে দেওয়ার জন্য ভারতে অবস্থানরত এক প্রভাবশালী চোরাচালান চক্রের সঙ্গে তাঁদের আর্থিক চুক্তি হয়েছিল। ঢাকার এই তিনজনই চট্টগ্রাম থেকে ইমনকে নিরাপদে যশোর সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার রুট ম্যাপ তৈরি করেছিলেন।
যেভাবে সাজানো হয়েছিল ৯টি টিমের যৌথ স্ট্রাইক
চট্টগ্রাম পুলিশ থেকে গোপন সংকেত পাওয়ার পরপরই যশোর জেলা পুলিশের এসপি সৈয়দ রফিকুল ইসলামের নির্দেশে এক রুদ্ধশ্বাস ও নিখুঁত ফাঁদ পাতা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশনস) মো. মিরাজুল ইসলাম ও আহসান হাবীবের প্রত্যক্ষ তদারকিতে অভিযানে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মাসুম খান, ডিবির ওসি সুজন কুমার মণ্ডল, এসআই কামরুজ্জামান, এসআই বাবলাসহ পুলিশের একাধিক সদস্য অংশ নেন। বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের হেডকোয়ার্টার সংলগ্ন কৌশলগত ঝুমঝুমপুর মোড়েই পাতা হয় চেকপোস্ট। পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার কোনো সুযোগই পায়নি ইমন ও তার গ্যাং।
হস্তান্তর ও পরবর্তী তদন্তের দিক
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একটি উচ্চপর্যায়ের দল ইতোমধ্যেই আসামিদের গ্রহণ করে চট্টগ্রামে নিয়ে গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, রিমান্ডে নিয়ে ইমনের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তাঁদের কাছে অস্ত্র জোগানদাতা, হুন্ডি চক্রের মাধ্যমে চাঁদার টাকা পাচারের মাধ্যম এবং চট্টগ্রাম ও ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ছড়িয়ে থাকা ইমনের অন্য সহযোগীদের নাম ও গোপন আস্তানা উন্মোচিত হতে পারে। শীর্ষ এই সন্ত্রাসীর পতন চট্টগ্রাম অপরাধ সিন্ডিকেটের ওপর এক বিরাট বড় আঘাত হানল বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। ছবি সংগৃহীত।

