কুপিয়ে লাশ পোড়াল দুর্বৃত্তরা!

কুপিয়ে লাশ পোড়াল দুর্বৃত্তরা!

মোঃ মাসুদ রানা (কালীগঞ্জ)ঝিনাইদহ :

জীবনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রবাসে পাড়ি দেওয়া এক তরুণের গল্প শেষ হলো অকল্পনীয় নির্মমতায়। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার যুবক নজরুল ইসলাম ও তার বান্ধবী কোহিনুর বেগমকে মালয়েশিয়ায় নৃশংসভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যার পর তাদের মরদেহ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষকে শোক ও ক্ষোভে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গোবরডাঙ্গা গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে এখন শুধুই আহাজারি। চারদিকে শোকের মাতম, বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন নজরুল ইসলামের মা, বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। বাবা হতবিহ্বল, আর স্বজনদের কান্নায় যেন ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবার।

পরিবারের সবার ছোট ছেলে নজরুল ইসলাম ২০১৮ সালে জীবিকার সন্ধানে মালয়েশিয়ায় যান। অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তোলেন একটি খামার, যেখানে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, এমনকি কুকুর-বিড়ালও লালন-পালন করতেন। ধীরে ধীরে স্বচ্ছলতার মুখ দেখছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সাফল্যই যেন তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়।

নিহত নজরুলের বোন শাপলা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ভাইটা ছোটবেলা থেকেই খুব কষ্ট করে বড় হয়েছে। আমাদের পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। ও বলতো, আপা, আর কষ্ট করতে হবে না, আমি সব ঠিক করে দেব। সেই ছেলেটাকে এভাবে কেড়ে নিলো! আমরা কল্পনাও করতে পারিনি ওর জীবনের এমন করুণ পরিণতি হবে। আমি আমার ভাইয়ের হত্যার সঠিক বিচার চাই।

জানা গেছে, ২০২৬ সালের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার শেনপাড়া এলাকার আব্দুল করিমের মেয়ে কোহিনুর বেগমের সঙ্গে নজরুল ইসলামের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নজরুলের অসুস্থতার খবর পেয়ে কোহিনুর বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় বন্ধু নজরুলের কাছে চলে যান। তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হলেও তারা একসঙ্গে থাকতেন।

গত ১৪ এপ্রিল রাতে দুর্বৃত্তরা প্রথমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের কুপিয়ে গুরুতর জখম করে এবং পরে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।

নিহতের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম বলেন, নজরুল আমাদের আগেই জানিয়েছিল, তার ব্যবসায়িক পার্টনারের সঙ্গে সমস্যা চলছে। কয়েকবার নাকি তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমরা বারবার বলেছিলাম, সব ছেড়ে দিয়ে দেশে চলে আসতে। কিন্তু সে বলেছিল, আর কিছুদিন সময় দিলেই সব গুছিয়ে আসবে। সেই ফেরার অপেক্ষাটাই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের শেষ অপেক্ষা হয়ে দাঁড়ালো।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নজরুল। নিজের খামারের গরু-ছাগল বিক্রি করে প্রায় সবকিছু গুছিয়ে আনছিলেন তিনি।

নিহতের ভাগ্নি সাদিয়া ইসলাম মীম বলেন, মামা আমাকে ফোন করে বলেছিল, আমি সব বিক্রি করছি, খুব তাড়াতাড়ি দেশে আসবো। তোমার জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসবো। সেই কথাগুলো এখন কানে বাজে। আমরা আর কিছু চাই না, শুধু চাই, আমার মামা ও তার সঙ্গীর হত্যার বিচার হোক। আর অন্তত তাদের মরদেহের অবশিষ্টাংশ যেন আমরা দেখতে পাই, শেষবারের মতো বিদায় জানাতে পারি।

নিহত নজরুলের বাবা মোতালেব হোসেন ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে আমাদের সংসারের ভরসা ছিল। ওর মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে আমরা কেউ স্বাভাবিক থাকতে পারছি না। তার মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছে। আমি শুধু একবার আমার ছেলে ও তার সঙ্গীর মুখ দেখতে চাই। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু তাকায়, তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে, এটাই আমাদের শেষ আবেদন।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে এলাকাবাসীও।
প্রতিবেশী ওমর ফারুক বলেন, নজরুল খুবই ভদ্র, পরিশ্রমী আর দায়িত্বশীল ছেলে ছিল। নিজের চেষ্টায় পরিবারকে ভালো অবস্থানে নিতে চেয়েছিল। এমন একটি ছেলেকে এভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা চাই, আন্তর্জাতিকভাবে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জেল্লাল হোসেন বলেন, ঘটনাটি বিদেশে সংঘটিত হওয়ায় সরাসরি কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দূতাবাস ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।

স্বপ্নের সন্ধানে প্রবাসে গিয়ে প্রাণ হারানো নজরুল ইসলাম ও তার বান্ধবী কোহিনুর বেগমের এই করুণ পরিণতি এখন একটি পরিবারের সীমা ছাড়িয়ে পুরো এলাকার শোক ও বেদনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের স্বজনদের একটাই দাবি, দোষীদের বিচার এবং প্রিয়জনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *