কাঁটাতারের ওপারে বিএসএফের ‘রহস্যময়’ বড় গাড়ি

কাঁটাতারের ওপারে বিএসএফের ‘রহস্যময়’ বড় গাড়ি

রফিক মন্ডল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) থেকে:

ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) জোরালো ও সুপরিকল্পিত ‘পুশ-ইন’ (অবৈধ অনুপ্রবেশ) করানোর অপচেষ্টা ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে নেমেছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি জোয়ানদের সমান্তরালে গ্রামের শত শত সাধারণ মানুষ এখন রাত জাগছেন। বিজিবির আধুনিক রাইফেল আর গ্রামবাসীর শত শত টর্চলাইটের আলো ও তীব্র শোরগোলের যৌথ প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত এই ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের সব ধরনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে।

আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন ২০২৬) মহেশপুর ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়ন সূত্র জানায়, এই ব্যাটালিয়নের অধীনে মোট ১২টি বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) রয়েছে। এর মধ্যে ভৌগোলিক কারণেই যাদবপুর, সামন্তা, মাটিলা ও বাঘাডাঙ্গাসহ অন্তত পাঁচটি বিওপি এলাকা পুশ-ইনের জন্য ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরো মহেশপুর উপজেলা জুড়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘ ৭৮ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। এর বড় একটি অংশে (৬৮ কিলোমিটার) ভারতের কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও যাদবপুর ও মাটিলা বিওপি সংলগ্ন প্রায় ১০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা সম্পূর্ণ বেড়াহীন ও অরক্ষিত। মূলত এই ভৌগোলিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিএসএফ রাতের আঁধারে বাংলাদেশে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ জোরপূর্বক পুশ-ইন করার ছক কষছে। বিষয়টি টের পেয়ে ওই সীমান্তে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বহুগুণ বাড়িয়েছে বিজিবি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ওবাইদুল ইসলাম পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলেন, “গত এক সপ্তাহ ধরে বিএসএফ রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের ওপারের সব ফ্লাডলাইট (বাতি) নিভিয়ে দিয়ে অতর্কিত পুশ-ইনের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় গ্রামবাসীদের তীব্র প্রতিরোধে তাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। ওপারে বিএসএফের নড়াচড়া টের পেলেই সীমান্ত ঘেঁষা গ্রামগুলোর মসজিদের মাইক থেকে গ্রামবাসীদের সতর্ক করা হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষ লাঠিসোঁটা ও টর্চলাইট নিয়ে বর্ডারে এসে তীব্র আলো নিক্ষেপ ও শোরগোল শুরু করলে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে।”

পিপুলবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা সাব্বির হোসেন ও গোপালপুর গ্রামের নাজমুল ইসলাম জানান, গত এক সপ্তাহে কাঁটাতারের ওপারে বিএসএফের বিশেষ সড়কে বড় বড় কিছু বন্দি পরিবহনের গাড়ির আনাগোনা দেখা গেছে, যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ভারতের দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ধরে এনে বর্ডারের গেট দিয়ে এপারে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাদের এই আয়োজন। কিন্তু বিজিবি ও সীমান্তের জনগণের শক্ত প্রতিরোধের মুখে গত কয়েকদিনে অন্তত পাঁচটি বড় পুশ-ইনের চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

এই স্পর্শকাতর ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মহেশপুর ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল মো. রফিকুল আলম অত্যন্ত দৃঢ়তা ও প্রত্যয় প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমাদের আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় এখন পর্যন্ত কোনো পুশ-ইনের ঘটনা ঘটতে দেওয়া হয়নি। তবে ওপার থেকে কিছু অপচেষ্টার সুনির্দিষ্ট খবর আমরা পেয়েছি। বিজিবি সদস্যরা বর্ডারে ২৪ ঘণ্টা হাই-অ্যালার্টে (সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থা) রয়েছে এবং আমাদের সব ধরনের সক্ষমতা ও রিসোর্সকে এখানে নিয়োজিত করা হয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “সবচেয়ে আশার কথা হলো, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সাধারণ মানুষ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা আমাদের জোয়ানদের সাথে রাত জেগে বর্ডারে টহল দিচ্ছেন। ইনশাআল্লাহ, দেশের এক ইঞ্চি জমিও আমরা অসুরক্ষিত রাখব না।” বর্তমানে যৌথ এই প্রতিরোধের ফলে মহেশপুর সীমান্ত জুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ত্রিমাত্রিক রূপ নিয়েছে। ছবি প্রতিবেদক।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *