স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে শিল্পের কাঁচামাল ‘কোয়ার্টজ পাউডার’ ঘোষণার আড়ালে ভারত থেকে আমদানি করা একটি চালানে বিপুল পরিমাণ যৌন উত্তেজক ভায়াগ্রার কাঁচামাল (সিলডেনাফিল সাইট্রেট) এবং বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরির অননুমোদিত ও ঘোষণাবহির্ভূত কাঁচামাল জব্দ করেছে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তারা। জব্দকৃত এই কোটি কোটি টাকার চালানটি বন্দর থেকে অবৈধভাবে গায়েব বা সরিয়ে নেওয়ার গোপন চেষ্টার আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট শেডগুলোতে ২৪ ঘণ্টার বিশেষ জোরদার নিরাপত্তা ও কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি জারি করা হয়েছে।
কাস্টমস ও বন্দর সূত্র জানায়, বিগত ১৫ মার্চ ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আরাফাত এন্টারপ্রাইজ ভারত থেকে প্রায় ১৬ টন পণ্য আমদানি করে বেনাপোল বন্দরে নিয়ে আসে। আমদানির নথিপত্রে (ঘোষণাপত্রে) পণ্যের বিবরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল ‘কোয়ার্টজ পাউডার’। তবে কাস্টমস গোয়েন্দা শাখার নিকট পূর্ব থেকেই সুনির্দিষ্ট গোপন তথ্য থাকায় পণ্য খালাস না করে বন্দরের ৩২ নম্বর শেডে চালানটি আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে যৌথ কায়িক পরীক্ষা চালানো হলে বের হয়ে আসে থলের বিড়াল। পাউডারের নামে বস্তা ভর্তি করে নিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ও অননুমোদিত রাসায়নিক ও ওষুধের কাঁচামাল উদ্ধার করা হয়।
জব্দকৃত পণ্যের রাসায়নিক পরীক্ষা শেষে জানা যায়, এই চালানের মধ্যে রয়েছে সর্বমোট ৩ হাজার ৬৭৫ কেজি সিলডেনাফিল সাইট্রেট (যা মূলত ভায়াগ্রার প্রধান কাঁচামাল)। এছাড়া বাকি মালামালের মধ্যে রয়েছে ৮ হাজার ২০০ কেজি কোয়ার্টজ পাউডার, ২ হাজার ১৫০ কেজি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ তৈরির উপাদান ওমিপ্রাজল/ইসোমিপ্রাজল ম্যাগনেসিয়াম ট্রাইহাইড্রেট, ৪৯৫ কেজি ইটোরিকক্সিব, ৩৫০ কেজি সেফট্রিয়াক্সন সোডিয়াম, ১৮০ কেজি হাইড্রোকুইনোন, ১২০ কেজি ম্যাগনেসিয়াম স্টিয়ারেট, ১০০ কেজি ক্যাফেইন, ১০০ কেজি রিবোফ্লাভিন সোডিয়াম ফসফেট, ৫০ কেজি স্যালিসিলিক অ্যাসিড এবং ৪০ কেজি হাঁপানির ওষুধ তৈরির উপাদান মন্টিলুকাস্ট সোডিয়ামসহ আরও কয়েক প্রকারের অননুমোদিত কাঁচামাল।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামী স্বাক্ষরিত বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেওয়া এক জরুরি চিঠিতে জানানো হয়েছে, এই জালিয়াতির চালানটি নিয়ে বর্তমানে উচ্চপর্যায়ের আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, একটি শক্তিশালী চোরাকারবারি চক্র কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিয়ে বা রাতের আঁধারে এই মূল্যবান চালানটি বন্দর থেকে চুরির চেষ্টা চালাতে পারে। এই আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে উক্ত শেডের বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়।
কাস্টমসের এই কড়া বার্তার পর থেকেই বেনাপোল বন্দরের ৩২ নম্বর শেডে সশস্ত্র আনসার সদস্য, বেসরকারি সিকিউরিটি গার্ড এবং বন্দরের নিজস্ব গোয়েন্দা (এনএসআই/ডিজিএফআই) শাখার সদস্যরা সার্বক্ষণিক যৌথ পাহারা দিচ্ছেন। পাশাপাশি ভায়াগ্রা সন্দেহে অতীতে জব্দ হওয়া আরেকটি চালান যেখানে রাখা আছে, সেই সংরক্ষিত শেডেও সিসিটিভি ক্যামেরাসহ নিরাপত্তা দ্বিগুণ করা হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন গণমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিশেষ চিঠি পাওয়ার পরপরই আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট শেডগুলোতে ২৪ ঘণ্টার অতিরিক্ত ও নিরেট নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। এই জাতীয় স্পর্শকাতর ও মূল্যবান জাতীয় চোরাচালান জব্দের ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের শিথিলতা বা অবহেলার সুযোগ রাখা হচ্ছে না।”
উল্লেখ্য, ইতিপূর্বেও ২০১৯ সালে সোডিয়াম গ্লাইকুলেট ঘোষণা দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা একটি চালানের পরীক্ষাগার টেস্টে ভায়াগ্রার কাঁচামাল শনাক্ত হয়েছিল। সেই কোটি কোটি টাকার চালানটি এখনো বন্দরের ৩৪ নম্বর শেডে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে। নতুন এই চালানের পেছনে ঢাকার আমদানিকারক চক্রের সাথে আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটি। ছবি সংগৃহীত।

