স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের উপশহর হাউজিং এস্টেটে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চালানো দুদিনের এক বিশাল উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে প্রশাসন ও ভুক্তভোগীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। খোদ জেলা প্রশাসককে (ডিসি) সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে, কোনো প্রকার আইনি বিধিমালা না মেনে বাইরের ম্যাজিস্ট্রেট এনে চালানো এই উচ্ছেদকে সরাসরি ‘সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও ঘরবাড়ি-দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়ায় হাজারো মানুষের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে উপশহরের আকাশ।
গত ১০ ও ১১ মে উপশহরের গাবতলা মোড়, খাজুরা স্ট্যান্ড, শিশু হাসপাতালের পাশ, বি ও ই ব্লকসহ বিশাল এলাকা জুড়ে বুলডোজার চালায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের খুলনা বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি দল। অভিযানে ৪ শতাধিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের ৫ একর সরকারি জমি উদ্ধার করার দাবি করা হয়।
কিন্তু এই অভিযানের পরই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান। তিনি সংবাদমাধ্যমকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “এই অভিযানের কোনো আইনি বৈধতা নেই। উচ্ছেদ করতে হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তথা ডিসিকে অবহিত করে স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ ফোর্স নিতে হয়। কিন্তু হাউজিং কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসন বা স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট কাউকেই কিছু জানায়নি। বিধি অনুযায়ী উচ্ছেদের ৭ দিন আগে দুটি নোটিশ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তারা তা করেনি। আমরা ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের পাশে আছি, যাদের বৈধ কাগজপত্র আছে তাদের সব ধরনের আইনি সহায়তা দেবে জেলা প্রশাসন।”
উচ্ছেদের শিকার রূমা খাতুন, বাবু, তামিম, কামরুলসহ অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী চোখের জল মুছতে মুছতে জানান, তাদের কাছে হাউজিং এস্টেটের দেওয়া ‘দায়মুক্তি সনদ’, রেজিস্ট্রি দলিল ও হালনাগাদ খাজনা-ট্যাক্সের সব বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। উচ্ছেদের সময় বারবার অনুরোধ করে এসব কাগজ দেখাতে চাইলেও উচ্ছেদকারীরা তা ছুড়ে ফেলে দেয়।
ওষুধ ব্যবসায়ী লাকী জানান, শিশু হাসপাতালের পাশে তার ফার্মেসি মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়ায় প্রায় ১০ লাখ টাকার ওষুধ মাটির সাথে মিশে গেছে। ভুক্তভোগী আনজুআরা বেগম অভিযোগ করেন, শিক্ষা বোর্ডের কর্মচারী সৈয়দ আহমেদের কাছ থেকে কেনা প্লটের সব বৈধ কাগজ থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদ দল গত ১১ এপ্রিল সকালে তার বাড়ি ভেঙে দেয় এবং উচ্ছেদের নামে নগদ টাকা ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলের গৃহায়ন কর্মকর্তা ইমাদুল ইসলাম তুহিনসহ কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে তাদের এখানে বসতি গড়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, আর এখন নতুন সিন্ডিকেট এসে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে কোনো নোটিশ ছাড়াই তাদের উচ্ছেদ করেছে। ক্ষুব্ধ জনতা এখন জমি ও মাথাগোঁজার ঠাঁই ফিরে পেতে ঢাকার সেগুনবাগিচায় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় ঘেরাওসহ উচ্ছেদকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সব বিতর্ক ও ডিসির বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের খুলনা বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান দাবি করেছেন, তারা চেয়ারম্যানের নির্দেশেই সব নিয়ম মেনে অভিযান চালিয়েছেন। আদালতে মামলার কোনো ‘স্টে অর্ডার’ উচ্ছেদের সময় কেউ দেখাতে পারেনি। উচ্ছেদের আগে এলাকায় মাইকিং ও নোটিশ করা হয়েছিল বলেও দাবি তার।
জেলা প্রশাসনের আপত্তি এবং শত শত মানুষের বৈধ কাগজ থাকার পরও জোরপূর্বক এই উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে যশোরের সচেতন মহলে এখন নানামুখী প্রশ্ন ও রহস্যের দানা বাঁধছে। ছবি সংগৃহীত।

