স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চরম বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই জোরপূর্বক এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা গ্রহণের হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং শিক্ষামন্ত্রীর তাত্ক্ষণিক পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে যশোর। আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) দুপুরে ‘প্রেসক্লাব যশোর’-এর সামনের প্রধান সড়কে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। প্রতীকী প্ল্যাকার্ড ও ক্ষোভের স্লোগানে স্লোগানে এ সময় রাজপথ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
দুপুরের এই প্রতিবাদী কর্মসূচিতে যশোরের বিভিন্ন স্বনামধন্য কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন। ছাত্র অধিকার ও ন্যায্য পরিবেশের লড়াইয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত এই সমাবেশে সম্মুখ থেকে নেতৃত্ব দেন যশোর সরকারি সিটি কলেজের তেজস্বী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আবু আনাস।
সমাবেশস্থলে অংশ নেওয়া বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা হাতে অধিকার আদায়ের নানা ফেস্টুন, ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড বহন করেন। এ সময় তাঁদের কণ্ঠে— “Our Future, Our Right” (আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের অধিকার), “We Will Stand and Fight” (আমরা দাঁড়াব এবং লড়ব), “বন্যার পানিতে নয়, ন্যায্য পরিবেশে পরীক্ষা চাই” এবং “এক দফা, এক দাবি—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাই”সহ শিক্ষামন্ত্রীর একগুঁয়ে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা বিভিন্ন স্লোগান প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
বিক্ষোভ সমাবেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়ে চলমান সংকটের চিত্র তুলে ধরে জোরালো বক্তব্য রাখেন শিক্ষার্থী সাবিরুল ইসলাম সিয়াম, সজীব হোসেন, রামিয়া, আইরিন তালুকদার তামান্না, নাঈম হোসেন, লিজু, ওমর ফারুক, জুলকার ইমন আল শিহাব, ফাহিম হোসেন ও ইমতিয়াজসহ বিভিন্ন কলেজের ছাত্র প্রতিনিধিরা।
বক্তারা অত্যন্ত ক্ষোভ ও কান্নায় ভেঙে পড়ে অভিযোগ করেন, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তা সরকার দেখেও না দেখার ভান করছে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ধোপড়াকুল ডিগ্রি কলেজের অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী দিশারানী মহন্ত এই প্রতিকূল ও প্লাবিত পরিবেশে পরীক্ষা দিতে গিয়ে তীব্র মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। দিশারানীর এই অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না।
শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা বলেন, “বন্যার পানির তোড়ে মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যাচ্ছে, যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, বই-খাতা ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এমন দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে মনোযোগ দেওয়ার মানসিক পরিস্থিতি তো নেই-ই, উল্টো পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়াটাই জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি। আমরা পরীক্ষা বর্জন করছি না, আমরা শুধু বন্যার পানি নেমে গিয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানাচ্ছি।”
সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে ৩টি মূল দাবি উত্থাপন করেন:
-
দেশের বন্যা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দেশজুড়ে চলমান এইচএসসি পরীক্ষা অবিলম্বে স্থগিত করতে হবে।
-
পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে নিরাপদ, শুষ্ক ও উপযুক্ত যাতায়াত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
-
শিক্ষার্থীদের জীবনের তোয়াক্কা না করে একমুখী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ায় ব্যর্থ শিক্ষামন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে।
শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া না হয়, তবে আগামী দিনে সারা দেশের ছাত্রসমাজকে সাথে নিয়ে আরও কঠোর ও রাজপথ অবরোধের মতো আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে। বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে প্রেসক্লাব চত্বর ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচিটি সমাপ্ত হয়। ছবি সংগৃহীত।

