স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
বরিশাল নগরীতে অগ্রণী হাউজিং (আবাসন) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আজিজ হাওলাদারের কার্যালয়ে ঢুকে তাঁর ওপর বর্বরোচিত কায়দায় শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে এবং অণ্ডকোষ চেপে ধরে জোরপূর্বক কোটি টাকার ব্যাংক চেক ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার এক সপ্তাহ পর কার্যালয়ের ভেতরের রোমহর্ষক সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর আজ রোববার বেলা ২টার দিকে নগরের সদর রোডের টপ টেন নামক একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে থেকে মূল অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আল মামুন উল ইসলাম আজ বিকেলে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
মামলার বিবরণ ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ জুন সন্ধ্যার পর নগরের সদর রোডে অবস্থিত অগ্রণী হাউজিংয়ের মূল কার্যালয়ে এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনার শিকার আব্দুল আজিজ হাওলাদার লোকলজ্জা ও নিরাপত্তার ভয়ে প্রথম দিকে বিষয়টি গোপন রাখলেও পরবর্তীতে গত বৃহস্পতিবার আদালতের দ্বারস্থ হন এবং শনিবার রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজটি প্রকাশ করলে মুহূর্তেই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় এবং পুরো বরিশালজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আব্দুল আজিজের কক্ষে হঠাৎ চারজন যুবক প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান লিটু নামে এক ব্যক্তি অত্যন্ত হিংস্রভাবে এমডির ওপর চড়াও হন এবং মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে আজিজ হাওলাদারের অণ্ডকোষ চেপে ধরে জোরপূর্বক ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, আরেকটি ব্ল্যাংক (সাদা) চেক এবং দুটি সাদা জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। মারধরের সময় ভুক্তভোগী ‘বাচ্চু, বাচ্চু’ বলে বাঁচানোর জন্য চিৎকার করলে আরেক ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করলেও লিটুর সহযোগীরা তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় এবং কাজ শেষে জোরপূর্বক চেক হস্তান্তরের ছবিও মোবাইলে ধারণ করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত লিটুর বাড়ি অগ্রণী হাউজিংয়ের অদূরেই কাটপট্টি সড়ক এলাকায়। তাঁর বড় ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি। লিটু নিজে নগরীতে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত থাকলেও তাঁর এই অপকর্মের ভিডিও প্রকাশের পর রোববার দুপুরে বরিশাল প্রেসক্লাবে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে জেলা ও মহানগর যুবদলের শীর্ষ নেতারা দাবি করেছেন, লিটু যুবদলের কোনো ওয়ার্ড কমিটিরও সাধারণ সদস্য নন এবং দলীয় কোনো কর্মসূচিতেও তাকে কখনও দেখা যায়নি।
ঘটনার শিকার ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ হাওলাদার জানান, লিটু একসময় অগ্রণী হাউজিংয়ের অংশীদার বা পার্টনার ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর বিনিয়োগের বিপরীতে সম্পূর্ণ জমি বুঝিয়ে দিয়ে তা বিক্রিও করে দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের কাছে তাঁর আর কোনো পাওনা বা দাবি নেই-মর্মে লিটুর নিজস্ব স্বাক্ষরযুক্ত একটি লিখিত অঙ্গীকারনামাও সংরক্ষিত আছে। তা সত্ত্বেও লিটু দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কাছে অন্যায়ভাবে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন এবং তা না দেওয়ায় ২৭ জুন সন্ধ্যায় সাড়ে ৭টার দিকে এই হামলা চালান। তবে ঘটনার পরপরই আব্দুল আজিজ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি লিখিতভাবে অবহিত করায় ওই চেকগুলো দিয়ে কোনো টাকা উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে গত বৃহস্পতিবার বরিশাল জজ আদালত তাঁর নালিশি মামলাটি এফআইআর (নিয়মিত মামলা) হিসেবে গ্রহণ করার জন্য কোতোয়ালি মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ প্রদান করেন।
অন্যদিকে, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে এই ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু দাবি করেছিলেন, ওই দিন যারা কার্যালয়ে গিয়েছিলেন তারা সবাই প্রতিষ্ঠানের বৈধ পরিচালক। আব্দুল আজিজ হাওলাদার সাধারণ পরিচালকদের বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এবং সেই টাকার হিসাব করা হচ্ছিল। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. আল মামুন উল ইসলাম জানান, আদালতের আদেশের কপি হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ মাঠে নামে এবং আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই চক্রের সাথে জড়িত বাকি আসামিদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। ছবি সংগৃহীত।


