মধ্যরাতে আঁতাত, দিনে বুলডোজার!

মধ্যরাতে আঁতাত, দিনে বুলডোজার!

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

আদালতের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা, জেলা প্রশাসনের কঠোর আপত্তি এবং নাগরিকদের বৈধ মালিকানার শত শত দালিলিক প্রমাণ—সবকিছুকে এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো উড়িয়ে দিয়ে যশোর উপশহর হাউজিং এস্টেটে এক নজিরবিহীন ও বর্বরোচিত উচ্ছেদযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ উঠেছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। গত ১০ ও ১১ মে পরিচালিত এই দুই দিনব্যাপী আকস্মিক অভিযানে কোনো প্রকার পূর্ব নোটিশ ছাড়াই প্রায় ৪ শতাধিক বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এই উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে তীব্র গণঅসন্তোষের মুখে এবার আইনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের স্থানীয় তিন শীর্ষ কর্মকর্তা। ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি এবং কোটি কোটি টাকার ‘প্লট বাণিজ্যের’ অভিযোগে ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অন্তত ১৪টি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়েরের চূড়ান্ত আইনি প্রস্তুতি নিয়েছেন সর্বস্ব হারানো ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উচ্ছেদ হওয়া সিংহভাগ পরিবারের কাছেই হাউজিং এস্টেটের দেওয়া বৈধ দায়মুক্তি সনদ, মূল রেজিস্ট্রি দলিল ও নিয়মিত খাজনা-ট্যাক্স পরিশোধের হালনাগাদ রসিদ রয়েছে। এমনকি ১২টি পরিবারের জমি নিয়ে আদালতে দেওয়ানি মামলা ও স্থিতাবস্থার আদেশ জারি থাকা সত্ত্বেও কোনো কিছুর তোয়াক্কা করেনি উচ্ছেদকারী দল। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, যেকোনো জেলায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তথা জেলা প্রশাসককে (ডিসি) অবহিত করে তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ ফোর্স নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও, যশোর হাউজিং কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে বহিরাগত ম্যাজিস্ট্রেট এনে এই কায়দায় ব্যারিকেড তৈরি করে। এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হাউজিংয়ের এই উচ্ছেদ অভিযান সম্পূর্ণ ‘অবৈধ ও বিধি-বহির্ভূত’। নিয়ম লঙ্ঘন করায় ক্ষুব্ধ জেলা প্রশাসক পরবর্তী কোনো অভিযানে হাউজিং কর্তৃপক্ষকে আর কোনো পুলিশ ফোর্স দেওয়া হবে না বলেও কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

এদিকে গত ১৪ জুন যশোর কালেক্টরেট সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এই বিতর্কিত উচ্ছেদ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সভায় জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন এবং যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহমান খানসহ সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উচ্ছেদের নামে উপশহরে সীমাহীন দুর্নীতি ও চরম বৈষম্য করা হয়েছে। নকশা অনুযায়ী উচ্ছেদ তালিকার বাইরে থাকা ঈদগাহ ও স্থানীয়দের স্বপ্নের ‘শাপলা কিণ্ডার গার্টেন’ স্কুল ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও, প্রভাবশালীদের দখলে থাকা একাধিক অবৈধ স্থাপনা রহস্যজনক কারণে ছোঁয়াও হয়নি। টাকার বিনিময়ে পুট ও প্লট বরাদ্দের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতেই হাউজিংয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ইমাদুল ইসলাম তুহিন একটি বিশেষ সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিয়েছেন বলে সভায় তথ্য প্রকাশ পায়।

এই উচ্ছেদ অভিযানের নিষ্ঠুরতার অন্যতম শিকার ১৯৮৬ সাল থেকে ব্যাংকে বৈধ চালানের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে বসবাস করা প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির আলী ও তাঁর ছেলে নয়ন। বৈধ নথিপত্র দেখানোর পরও তাঁদের বসতভিটা রক্ষা পায়নি। অপর ভুক্তভোগী আনোয়ারা বেগম ও তাঁর ছেলে বাবু জানান, হাউজিং কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ত্রুটির বিপরীতে তাদের যে দায়মুক্তি সনদ দেওয়া হয়েছিল, তা ছিঁড়ে ফেলার হুমকি দিয়ে ১১ মে সকালে তাদের বাড়িটি ভেঙে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, অবৈধ উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করায় নজরুল ইসলাম ঝন্টু নামে এক স্থানীয় এক ব্যক্তিকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় উচ্ছেদকারী চক্রের সদস্যরা, যার প্রতিকার চেয়ে তিনি যশোর পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা কমিটির জরুরি সিদ্ধান্তে এই ভয়াবহ জালিয়াতির রহস্য উদঘাটনে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনের এই তদন্তের ঘোষণায় ভুক্তভোগীদের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, তারা আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে বিশ্বাস না রেখে সরাসরি আদালতের মাধ্যমে অভিযুক্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আশিক আহমেদ সাকিব, উপ-সহকারী প্রকৌশলী ইমাদুল ইসলাম তুহিন এবং বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনি লড়াইয়ের ঢাল তৈরি করছেন। তবে সব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও মনগড়া’ দাবি করে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আশিক আহমেদ সাকিব বলেন, তারা শতভাগ আইনি প্রক্রিয়া মেনেই খাস জমি উদ্ধার করেছেন এবং উচ্ছেদের সময় কোনো বাসিন্দা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। কিন্তু জেলা প্রশাসনের কড়া অবস্থান এবং গণমামলার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় হাউজিংয়ের অভিযুক্ত কর্মকর্তারা এখন জনরোষ থেকে বাঁচতে গা ঢাকা দিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *