স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নে সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী মুখোশের আড়ালে গড়ে ওঠা এক বিশাল ও ভয়ঙ্কর মাদক সাম্রাজ্যের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত সোমবার (১৫ জুন) বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ইছালী ইউনিয়নে এক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে শীর্ষ মাদক কারবারি ও ডিলার মহিদুল ইসলামকে আটক করেছে র্যাব-৬ যশোর ক্যাম্পের একটি চৌকস দল। এ সময় মহিদুলের মালিকানাধীন ‘বেস্ট ব্রেড অ্যান্ড বেকারি’ কারখানার জেনারেটর কক্ষ থেকে ২৯ বোতল আমদানিনিষিদ্ধ ভারতীয় উইনকরেক্স কফ সিরাপ উদ্ধার করা হয়। মহিদুলের পরিবার এই অভিযানকে ‘ব্যক্তিগত আক্রোশ’ ও ‘পরিকল্পিত ফাঁদ’ বলে দাবি করলেও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তার অন্ধকার জগতের রোমহর্ষক সব চাঞ্চল্যকর তথ্য।
আটককৃত মহিদুল ইসলাম ইছালী ইউনিয়নের এনায়েতপুর গ্রামের বাসিন্দা। অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান কোটিপতি মহিদুলের অতীত ছিল অত্যন্ত সাধারণ। একসময় সে এলাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত। তার বাবা মোহাম্মদ আব্দুল খালেক ছিলেন এলাকার ঘর জামাই। সেই সূত্রে এনায়েতপুর গ্রামে স্থায়ী হওয়া মহিদুল রাতারাতি বড়লোক হওয়ার নেশায় জড়িয়ে পড়ে নিষিদ্ধ মাদক ব্যবসায়। যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে অল্প দিনেই মাদক পাচার ও বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করে সে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এবং নিজের কালো টাকা সাদা করতে সে লোকদেখানো ‘বেস্ট ব্রেড অ্যান্ড বেকারি’ নামের একটি কারখানা ও অফিস গড়ে তোলে। প্রকৃতপক্ষে এই বেকারিটি ছিল তার মাদক সিন্ডিকেটের একটি সেফ হাউস বা নিরাপদ আস্তানা মাত্র। এই মাদকের টাকায় সে বিঘার পর বিঘা ধানি জমিসহ বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক বনে গেছে। বর্তমানে সে নিজে সরাসরি সামনে না থেকে বেতনভুক্ত লোক নিয়োগ করে পুরো যশোর শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকের বড় বড় চালান সরবরাহ বা মূল ডিলার হিসেবে কাজ করে আসছিল। এই চক্রে তার প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করে তার আপন ভাই মহির ও মহিদুলের স্ত্রী।
সোমবার রাতে র্যাব যখন এনায়েতপুরের কারখানায় অভিযান চালিয়ে মহিদুলকে আটক করে, তখন তাকে ছাড়িয়ে নিতে তার ভাই মহির ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা চরম ধূর্ততার আশ্রয় নেয়। তারা র্যাবের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীকে খেপিয়ে তুলতে এবং একটি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ‘মব’ তৈরি করতে স্থানীয় একটি মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ডাক দেয়। কিন্তু মহিদুলের মাদক কারবারে অতিষ্ঠ ও সচেতন এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে অপরাধীদের সেই চক্রান্ত সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মহিদুল সম্প্রতি নিজেকে একজন বড় সমাজসেবক ও দানবীর হিসেবে জাহির করা শুরু করেছিল। আগামীতে স্থানীয় ইউপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার খায়েশ থেকে সে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পেতে এক অসুস্থ ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা দানও করে, যা ছিল মূলত বিষাক্ত মাদকের টাকা।
তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় ৯টি মাদকের সুনির্দিষ্ট মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত পূর্বের মামলার নম্বরগুলো হলো—জিআর-২৩৪/১৬, জিআর-৫১৭/১৮, জিআর-৯০১/১৯, জিআর-১১২/২০, জিআর-৪৫৫/২১, জিআর-৩০৯/২২, জিআর-৭৮২/২৩, জিআর-০৫/২৪ এবং সর্বশেষ জিআর-১৬৭/২৫। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, মহিদুল যদি সত্যিই নির্দোষ বা ভালো মানুষই হবে, তবে তার নামে এর আগে ৯টি মাদকের নিয়মিত মামলা কীভাবে হলো?
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মহিদুলের আটকের পর কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে তার পরিবারের পক্ষে বা মহিদুলের পক্ষে যারা ইন্টারভিউ বা বক্তব্য দিয়েছেন, তারা সবাই তার পোষ্য এবং ঘনিষ্ঠ বলয়ের লোক। মহিদুলের অবৈধ অর্থের ভাগ ও বিভিন্ন সময় অর্থনৈতিক সুবিধা হাসিল করার কারণেই বিতর্কিত ওই ব্যক্তিরা ক্যামেরার সামনে মাদক ব্যবসায়ীর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, যা দেখে পুরো ইছালীবাসী অবাক ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এলাকায় মাদকসেবী ও প্রভাবশালীদের নিয়ে মহিদুল এমন একটি শক্তিশালী ও ভয়ঙ্কর বলয় তৈরি করেছিল যে, ভয়ে সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেত না। এলাকার যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া এই গডফাদারের আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো যশোর ও ইছালী এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে। এলাকাবাসী এই চক্রের মূল উপড়ে ফেলতে প্রশাসনের কাছে কঠোর তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। ছবি সংগৃহীত।


