ঝিনাইদহে অপরাধের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী : পাঁচ মাসে ২১ লাশ!

ঝিনাইদহে অপরাধের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী : পাঁচ মাসে ২১ লাশ!

রফিক মন্ডল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) থেকে:

ঝিনাইদহ জেলা জুড়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক চরম উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। গত মাত্র ৫ মাসে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে খুনসহ অন্তত ২১ জনের লাশ উদ্ধার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উদ্ধারকৃত লাশের মধ্যে ১৩টিই নৃশংস ও সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। বাকি ৮টি লাশ ঝুলন্ত বা বিভিন্ন স্থান থেকে রহস্যজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, যা পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত ও পুলিশি তদন্তে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলাজুড়ে ঘটে যাওয়া এসব নৃশংস অপরাধের নেপথ্যে মূলত তীব্র দাম্পত্য কলহ, সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের দলাদলি এবং রাজনৈতিক বিরোধের চরম রূপ কাজ করছে।

পুলিশের ক্রাইম রেকর্ড ও এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ মাসে জেলায় যে ১৩টি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বর্বরোচিত শিকার হয়েছে নারী ও শিশুরা। এর মধ্যে সদর উপজেলার গোয়ালপাড়া গ্রামের বুলবুলি, পাগলাকানাই এলাকার খুশি খাতুন, মহেশপুর উপজেলার ঘোষপুর গ্রামের জোহরা আক্তার এবং কালীগঞ্জ উপজেলার বাদুরগাছা গ্রামের নিষ্পাপ শিশু তাবাসসুমকে পারিবারিক কলহ ও নির্মমতার জেরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

জেলায় ঘটে যাওয়া অন্য হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে সামাজিক দলবাজি ও তুচ্ছ অহংকারের চরম রূপ দেখা গেছে। হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হরিশপুর গ্রামে কেবল মোটরসাইকেলের হর্ন বাজানো নিয়ে তুচ্ছ বিরোধের জেরে খুন হন দেলোয়ার নামের এক ব্যক্তি। এছাড়া শৈলকুপার মাধবপুর গ্রামে সামাজিক মাতব্বরি ও বিরোধে নিহত হন মোহন শেখ। অন্যদিকে মহেশপুরের পলিয়ানপুর এলাকায় ইছামতি নদী থেকে আফগান নাগরিক হাসমত মোহাম্মদী এবং রতিকান্ত জয়ধর নামের দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়, যা পরে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড বলে প্রমাণিত হয়।

হত্যাকাণ্ডের তালিকায় রাজনৈতিক বলির সংখ্যাও কম নয়। হরিণাকুণ্ডুর কুল্ল্যাগাছা ভাতুড়িয়া গ্রামে বিএনপি কর্মী আবুল কাশেম, সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামে বিএনপি নেতা তরু মুন্সি এবং খোদ জেলা শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার তাজ ফিলিং স্টেশনে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা নীরবকে। এ ছাড়া হরিণাকুণ্ডুর দৌলতপুর গ্রামে ভ্যানচালক জসিম এবং শৈলকুপার জয়ন্তিনগর গ্রামে কেসমত আলীকে প্রতিপক্ষরা নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে।

১৩টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ছাড়াও জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আরও ৮টি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ জানিয়েছে, এই ৮টি লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত (পোস্টমর্টেম) প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আইনি নিয়মে সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত ফরেনসিক রিপোর্টে এই ৮টি মৃত্যুর পেছনে আত্মহত্যার অলামত মিলেছে। তীব্র পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কোন্দল ও মানসিক অবসাদই এই তরুণ-তরুণী ও ব্যক্তিদের আত্মহননের মূল কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঝিনাইদহ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি সায়েদুল আলম এই অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ঝিনাইদহে বিশেষ করে শৈলকুপা, হরিণাকুণ্ডু ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ দলবাজি ও সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের এক নোংরা লড়াই চলে আসছে। সামান্য উস্কানিতেই এখানে লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনাখুনি হয়। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে পারিবারিক কলহ ও নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, যার বলি হচ্ছে নিরীহ সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশুরা।”

জেলায় সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে ঝিনাইদহের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার বিল্লাল হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “প্রতিটি লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটনসহ আসামিদের আইনের আওতা আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই প্রধান দুটি রাজনৈতিক হত্যা মামলার আসামিরা গ্রেফতার হয়েছেন, আবার অনেকেই তোপের মুখে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছেন। জেলায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং অপরাধীদের শিকড় উপড়ে ফেলতে জেলা পুলিশের বিশেষ চিরুনি অভিযান ও তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।”

ফাইল ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *