ড্রাগ হাব কালীগঞ্জ!

মোঃ মাসুদ রানা, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) :

এক সময়ের শান্ত ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য চেনা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা এখন সর্বনাশা মাদকের ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজার পাশাপাশি সম্প্রতি যোগ হওয়া ‘ট্যাপেন্টাডল’ জাতীয় নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের সহজলভ্যতা উপজেলার সামগ্রিক পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানেই এখন মাদকের অবাধ বিস্তার। এর ফলে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি এবং পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা।

তালিকায় ৪২টিরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ স্পট:

 অনুসন্ধানে জানা যায়, কালীগঞ্জ পৌর এলাকা ছাড়িয়ে মাদকের বিষাক্ত নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছে উপজেলার আনাচে-কানাচে। স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, বর্তমানে উপজেলার ৪২টিরও বেশি এলাকা মাদকের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

  • পৌর ও আশপাশের জোন: কাশিপুর, চাচড়া, শিবনগর, আড়পাড়া, নদী-আড়পাড়া, ঢাকালে পাড়া, বলিদাপাড়া, সিংঙ্গী, রায়গ্রাম, দুলালবন্দিয়া, ফয়লা, হেলাই, পাইকপাড়া, শ্রীরামপুর, আনন্দবাগ, খয়েরতলা, বাকুলিয়া, ভাটপাড়া, মহাদেবপুর ও আলাইপুর।

  • ইউনিয়ন ও বাজার জোন: বারোবাজার, মঙ্গলপৈতা, সোনালী ডাঙ্গার মোড়, বারফা ব্রিজ, মাজদিয়া বাউড়ের বড় ব্রিজ, বাদুরগাছা, মিঠাপুকুর, মহিষাহাটি, রাখালগাছি, ধোপাদি বাজার, কাষ্ঠভাঙ্গা ও সাদিকপুর।

এসব এলাকায় রাত-দিন সমানতালে চলছে মাদক বেচাকেনা ও সেবনের মহোৎসব। এমনকি পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও মাদকসেবীরা প্রতিদিন কালীগঞ্জে এসে নির্বিঘ্নে মাদক গ্রহণ করে চলে যাচ্ছে, যা এই অঞ্চলকে একটি আঞ্চলিক মাদককেন্দ্রে (ড্রাগ হাব) পরিণত করছে।

নেপথ্যে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা:

এলাকাবাসীর প্রকাশ্য অভিযোগ, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষমতাধর ব্যক্তির প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এই কোটি টাকার মাদক ব্যবসা টিকে আছে। মাদক কারবারিরা এতটাই বেপরোয়া যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও খুব দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই সিন্ডিকেট সচল করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, বর্তমানে ১২ থেকে ১৩ বছরের স্কুলপড়ুয়া কিশোরদের মধ্যেও মাদকাসক্তির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অশনিসংকেত। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক আনোয়ারুল ইসলাম রবি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি আস্ত পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে অনেক স্বপ্নবাজ তরুণ আজ অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।”

প্রশাসনের বক্তব্য ও ধীরগতির অভিযোগ:

যদিও র‍্যাব, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), থানা পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযানের দাবি করছে, তবে সাধারণ মানুষের মতে—সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান জোরালো অভিযান অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের থেকে মাসোহারা বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার গুঞ্জনও রয়েছে।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শেখ মোহাম্মদ হাসেম আলী বলেন, “মাদক কারবারের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

একই সুর কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জেল্লাল হোসেনের কণ্ঠেও। তিনি জানান, “মাদক নির্মূলে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করতে জনসাধারণের তথ্যগত সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।”

সমাধানের পথ কোন দিকে?

সচেতন মহলের মতে, শুধু মাঝেমধ্যে ছিঁচকে মাদকসেবী ধরা বা রুটিনমাফিক অভিযানে এই ভয়াবহতা দূর করা সম্ভব নয়। কালীগঞ্জকে মাদকমুক্ত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, এলাকাভিত্তিক স্থায়ী পুলিশি চেকপোস্ট, নিয়মিত টহল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের দ্রুত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে একটি সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না তুললে অদূর ভবিষ্যতে কালীগঞ্জের সামাজিক নিরাপত্তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফাইল ছবি।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *