শোকের দিনে বাংলোতে স্ত্রীর ৫ গান ও জমকালো আসর!

শোকের দিনে বাংলোতে স্ত্রীর ৫ গান ও জমকালো আসর!

রফিক মন্ডল, কোটচাঁদপুর (, ঝিনাইদহ) থেকেঃ

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাহফুজ আফজালকে তাঁর বর্তমান কর্মস্থল থেকে আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে ক্লোজড বা সংযুক্ত করার নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর ও আসল কারণগুলো অবশেষে প্রকাশ পেয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাঁকে আজ ৫ জুনের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করে সদর দপ্তরে রিপোর্টের নির্দেশ দেওয়া হলেও সরকারি সেই দাপ্তরিক আদেশে প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

তবে মাঠপর্যায়ের অত্যন্ত দায়িত্বশীল অনুসন্ধান ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঝিনাইদহের এসপি হিসেবে যোগ দেওয়ার পর মো. মাহফুজ আফজালের সংক্ষিপ্ত দায়িত্বকালেই জেলা জুড়ে একের পর এক লাশ উদ্ধার ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। বিশেষ করে হরিণাকুণ্ডুর ভাতুড়িয়া এবং সদর উপজেলার মাধবপুর গ্রামে সংঘটিত দুটি চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, শৈলকুপায় একের পর এক সামাজিক বিরোধকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং পুরো জেলা জুড়ে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে জেলা পুলিশের চরম শৈথিল্যতা ও এসপির প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা সরকারকে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ্য দিবালোকে শহরের চর খাজুরা গ্রামের একটি আবাসনে শিশু ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা এবং এনসিপি নেতা নাসির উদ্দীন পাটোয়ারীর ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা স্থানীয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের চরম ব্যর্থতা ও এসপির অযোগ্যতাকেই সরকারের উচ্চমহলে স্পষ্ট করে তোলে।

এদিকে, এই চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার পাশাপাশি এসপি মাহফুজ আফজালের সাম্প্রতিক একটি স্পর্শকাতর ও ব্যক্তিগত বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পুরো জেলা জুড়ে সমালোচনার আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে, যা তাঁর প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকীর মতো একটি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিকভাবে অতি শোকাবহ দিনে এসপি তাঁর সরকারি বাসভবনে (বাংলো) স্ত্রীর বিশেষ অনুরোধে একটি জমকালো ‘ঈদ পুনর্মিলনী’ ও জমজমাট সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করেন। দেশ ও জেলা জুড়ে যখন জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নানা শোকাবহ ও গম্ভীর রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মসূচি চলছিল, ঠিক সেই শোকের রাতে এসপির বাংলোতে এমন আলোকোজ্জ্বল ও জমকালো সাউন্ড সিস্টেমের বাদ্যবাজনার আয়োজনে খোদ আমন্ত্রিত অতিথিদের অনেকেই চরম বিব্রত ও ক্ষুব্ধ হন।

অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে জেলা জুড়ে আরও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে যখন খোদ এসপির স্ত্রী নিজেই সেই আনন্দঘন মঞ্চে দাঁড়িয়ে একাধারে পাঁচটি গান পরিবেশন করে পুরো আসর মাতিয়ে রাখেন। শোকের দিনে এমন অতি উৎসাহী ও প্রমোদপূর্ণ জমকালো আয়োজন জেলার সচেতন নাগরিক সমাজ, সুশীল সমাজ এবং আমন্ত্রিত বিশিষ্ট অতিথিদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল মহল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, একদিকে একের পর এক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের চরম ব্যর্থতা, জেলায় ক্রমাগত লাশ উদ্ধার এবং সর্বশেষ এই চরম বিতর্কিত ও অপেশাদার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জের ধরেই শেষ পর্যন্ত কোনো কারণ না দর্শিয়েই তাঁকে ঝিনাইদহ থেকে তড়িঘড়ি করে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে ক্লোজ করা হয়েছে।    ফাইল ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *