স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
সরকারি হাসপাতালের নিখরচায় বা নামমাত্র মূল্যের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করে সাধারণ মানুষকে বেসরকারি ক্লিনিকের চড়া বিলের মুখে ঠেলে দেওয়া এক ‘রোগী শিকারী’ দালালকে আটক করা হয়েছে। আজ রোববার (১৪ জুন ২০২৬) ভরদুপুরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল (সদর) হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রোগীদের ফুসলানোর সময় সুমন (২৫) নামে ওই সক্রিয় দালালকে হাতেনাতে ধরে ফেলে হাসপাতালের দায়িত্বরত পুলিশ।
আটককৃত সুমন যশোর সদর উপজেলার বিরামপুর এলাকার (১ নম্বর ওয়ার্ড) বাবু দেবনাথের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের ভেতরে এক শ্রেণির অসাধু ক্লিনিক মালিকদের ‘কমিশন এজেন্ট’ হিসেবে তিনি কাজ করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সুমনের টার্গেট ছিল মূলত গ্রাম থেকে আসা সরল-সোজা ও দরিদ্র রোগীরা। ডাক্তার দেখানোর লাইন কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সিরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি রোগীদের আশ্বস্ত করার ভান করতেন। এরপর সুযোগ বুঝে, “সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা নেই”, “এখানে টেস্ট করলে রিপোর্ট ভুল আসবে” কিংবা “ডাক্তার সাহেব বাইরে উনার নিজের ক্লিনিকে ভালো দেখেন”— এমন নানা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে রোগীদের মগজ ধোলাই করতেন। এরপর তাদের ভুল বুঝিয়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন পকেটে পুরতেন।
আজ রোববার দুপুর ১টা ৩০ মিনিটের দিকে একইভাবে হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে কয়েকজন রোগীকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছিলেন সুমন। তাঁর সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি ও ফিসফিসানি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ বক্সকে জানান। পুলিশ দ্রুত অ্যাকশনে গিয়ে হাতেনাতে সুমনকে ধরে ফেলে এবং টেনে হিঁচড়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়ে নিয়ে যায়।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি এই বড় হাসপাতালটিতে যখন আধুনিক সব চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে, তখন এই দালালচক্র সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোর ব্যবসা চাঙ্গা করছে। এতে সাধারণ মানুষ যেমন সর্বস্বান্ত হচ্ছে, তেমনি সরকারি স্বাস্থ্য খাতের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছে, সুমনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এই চক্রের পেছনে আর কারা আছে, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই সাথে হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বস্তরের রোগীদের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। কোনো বহিরাগত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি যদি হাসপাতালের বাইরে কোনো ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ বা প্রলোভন দেখায়, তবে সরাসরি কাউন্টারে বা দায়িত্বরত সিকিউরিটিকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
ডায়াগনস্টিক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ‘স্ফুলিঙ্গ’র বিশেষ অনুসন্ধান:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আটককৃত সুমন মূলত সদর হাসপাতালের সামনে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা কিছু অখ্যাত, লাইসেন্সবিহীন ও দালাল নির্ভর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের হয়ে ফ্রন্টলাইন ফাইটার হিসেবে কাজ করতেন। সরকারি হাসপাতালের দোরগোড়ায় বসে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার মূল মরণফাঁদটি পেতে রেখেছে এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোই।
যশোর সদর হাসপাতালের সামনে গড়ে ওঠা এসব দালাল নির্ভর ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে ‘স্ফুলিঙ্গ’র পক্ষ থেকে একটি বিশেষ তথ্যবহুল ও অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ করার কাজ জোরকদমে চলছে। মাঠপর্যায়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। খুব শীঘ্রই এসব অখ্যাত, অনুমোদনহীন ও জুলুমবাজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্যামেরা ট্র্যাপসহ একটি সচিত্র ধামাকা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

