স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাদিয়াখালি পিয়ারাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোস্তম আলী মণ্ডলের লাগামহীন দুর্নীতি, একাধিক নারীঘটিত অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সাবেক স্ত্রীকে চরম প্রতারণার অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে সন্তান হত্যা ও টাকা আত্মসাতের বিচারের দাবিতে ভুক্তভোগী সাবেক স্ত্রী বিদ্যালয়ে হাজির হলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে তার অফিস কক্ষে অবরুদ্ধ করে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্র লিখে নেন। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার জয়নাল আবেদিনের মেয়ে শাহানা বেগমের সাথে ২০১৯ সালে গোপনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন প্রধান শিক্ষক রোস্তম আলী মণ্ডল। বিয়ের পর গাইবান্ধা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় তারা বসবাস শুরু করেন। এ সময় শাহানা বেগমের পূর্বের স্বামীর জমি বিক্রির নগদ ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিভিন্ন অজুহাতে সুকৌশলে হাতিয়ে নেন এই অর্থলোভী শিক্ষক।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শাহানা বেগম অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই সন্তান যেন এই পৃথিবীতে আসতে না পারে, সেজন্য তার ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন প্রধান শিক্ষক রোস্তম। গত ১৮ জানুয়ারি তাদের একটি ফুটফুটে সন্তান জন্ম নেয়। শাহানা বেগমের অভিযোগ, জন্মের পরপরই প্রধান শিক্ষক নবজাতকটিকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ বা অন্য কোনো উপায়ে হত্যা করেন। এরপর ঘটনা ধামাচাপা দিতে কোনো প্রকার ধর্মীয় রীতি, জানাজা বা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে গাইবান্ধা পৌর গোরস্থানে সাধারণ পুরাতন কাপড়ে জড়িয়ে শিশুটিকে দাফন করে আসেন।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, ২০২১ সালে পিয়ারাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই রোস্তম আলী মণ্ডলের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম ও একাধিক নারীঘটিত কেলেঙ্কারির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অতীতে বারবার এসব অপরাধ হাতেনাতে প্রমাণিত হলেও পরিচালনা কমিটির এক ‘অদৃশ্য শক্তির’ ছত্রছায়ায় তিনি সবসময় পার পেয়ে আসছিলেন।
দুপুরে সন্তান হত্যা ও টাকা আত্মসাতের বিচারের দাবিতে সাবেক স্ত্রী শাহানা বেগম আচমকা স্কুলে হাজির হলে শিক্ষকের ভেতরের আসল রূপ বা থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে বিদ্যালয়ের বর্তমান-প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ স্কুল প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা এই লম্পট ও দুর্নীতিবাজ শিক্ষকের অপসারণের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন এবং একপর্যায়ে তাকে তার অফিস কক্ষে অবরুদ্ধ করে বিদ্যালয়ের অফিশিয়াল প্যাডে তার পদত্যাগপত্র লিখে নেন।
পরিস্থিতি বেগতিক ও গণপিটুনির আশঙ্কা দেখে তাৎক্ষণিকভাবে থানায় খবর দেওয়া হলে গাইবান্ধা সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাহাঙ্গীর আলম বাবু এবং সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বিশাল পুলিশ ফোর্সসহ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা দীর্ঘ প্রচেষ্টায় উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করে অবরুদ্ধ প্রধান শিক্ষক এবং অভিযোগকারী শাহানা বেগমকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে আসেন।
সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাহাঙ্গীর আলম বাবু জানান, “শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। পুরো ঘটনাটি নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, শিক্ষা ও শিক্ষক সমাজকে কলঙ্কিত করা এই রোস্তম আলীকে অবিলম্বে চাকরি থেকে স্থায়ী বরখাস্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, অন্যথায় আরও বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভুক্তভোগী শাহানা বেগমের পক্ষ থেকে থানায় নিয়মিত মামলার প্রস্তুতি চলছিল। ছবি সংগৃহীত।


