শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি:
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার রাজৈর গ্রামে এক শিউরে ওঠার মতো মর্মান্তিক ও রহস্যে ঘেরা ঘটনা ঘটেছে। নিজ শয়নকক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এক দম্পতির নিথর দেহ। তবে মৃত্যুর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ঘরেই মিলেছে এক অলৌকিক জীবনের স্পন্দন—মায়ের লাশের পাশেই ক্ষুৎপিপাসায় কাঁদছিল এই দম্পতির মাত্র দুই মাস বয়সী এক দুগ্ধপোষ্য শিশুসন্তান। আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকালে পুলিশ নিহতদের শয়নকক্ষ থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধারের পাশাপাশি একটি রহস্যময় চিরকুটও জব্দ করেছে।
নিহতরা হলেন— রাজৈর গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে পেশায় জেলে কবির হোসেন এবং তাঁর স্ত্রী হালিমা বেগম। এই দম্পতির ঘরে রয়েছে সাত বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান এবং দুই মাস বয়সী এক পুত্রসন্তান।
আজ সকালে ঘরের ভেতর থেকে দুই মাসের অবুঝ শিশুটির একটানা কান্নার আওয়াজ পেয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীরা দরজায় কড়া নাড়েন। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে একপর্যায়ে ঘরে প্রবেশ করতেই তাঁদের চোখ কপালে ওঠে। বিছানায় পাশাপাশি শোয়া অবস্থায় পড়ে ছিল কবির ও হালিমার নিথর দেহ, আর তার পাশেই নিদারুণ অসহায়ত্বে হাত-পা ছুড়ে কাঁদছিল তাঁদের দুই মাসের কোলের শিশুটি।
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি হাতে লেখা সংক্ষিপ্ত চিরকুট উদ্ধার করেছে, যেখানে লেখা— ‘এই মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।’ আপাতদৃষ্টিতে এটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করা হলেও, নিহতের শরীরের আলামত অন্য কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত হালিমা বেগমের গলায় স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন বা দাগ পাওয়া গেছে, যা এই মৃত্যুকে ঘিরে গভীর ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে।
নিহত হালিমার বাবা বাবুল হাওলাদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন:”আমাদের চোখের আড়ালে কী ঘটেছে আমরা জানি না। আমরা শুধু চাই—নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আমার মেয়ে আর জামাইয়ের মৃত্যুর আসল সত্যটা বেরিয়ে আসুক।”
নিহতের স্বজন ও স্থানীয়দের একাংশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক নানা টানাপোড়েন ও কলহ চলছিল এই দম্পতির মধ্যে। সেই বিরোধের জেরে স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার পর স্বামী নিজে বিষপান বা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের হাত রয়েছে—তা নিয়ে এলাকায় তুমুল আলোচনা চলছে।
খবর পেয়ে পুলিশ সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে লাশ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রোকেয়া খানম বলেন “মরদেহের সুরতহালে কিছু সন্দেহজনক আলামত ও গলায় আঘাতের দাগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া চিরকুটটি আসলেই তাঁদের কারও লেখা কি না, তাও আমরা খতিয়ে দেখছি। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলেই স্পষ্ট জানা যাবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা।”
দুই মাস আর সাত বছরের দুটি অবুঝ সন্তানকে চিরকালের জন্য এতিম করে এই দম্পতির আকস্মিক চলে যাওয়ার ঘটনায় পুরো শরণখোলা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ছবি সংগৃহীত।

