স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে। পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘাত তীব্রতর হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। এর ফলে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যার ফলেই এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, আজ সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হতেই অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। গত রাতেও ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী টানা নবম বারের মতো বড় ধরনের বোমাবর্ষণ করলে বাজার এই মারমুখী প্রতিক্রিয়া দেখায়।
আজ বাংলাদেশ সময় ভোরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২.৭৫ ডলার বা ৩.১২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০.৮৫ ডলারে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার নির্ধারণী ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২.৫৬ ডলার বা ৩.১০ শতাংশ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৮৫.৫ ডলারে।
এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল মূলত ইরানের এক হামলায় দুই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার পর। এর জবাবে ওয়াশিংটন ইরানে মুহুর্মুহু বিমান হামলা চালালে তেহরান প্রশাসনও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত করে দেয়। একই সাথে তারা বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০ শতাংশ বা পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই উপসাগরীয় রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা এখন সম্পূর্ণ আটকে গেছে।
ইতিহাস বলছে, চলতি জুলাই মাসের ৭ তারিখে হরমুজ প্রণালির কাছে কাতার ও সৌদি আরবের দুটি জ্বালানি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে (তখন দাম ছিল ৭৩.৮৫ ডলার)। তবে আজকের অচলাবস্থায় তা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেল। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার যেখানে ৮টি জাহাজ এই প্রণালি পার হতে পেরেছিল, সেখানে রবিবারে তা কমে মাত্র ৪টিতে নেমে এসেছে।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের বিশেষজ্ঞ স্টিফেন ইনেস ফরাসি সংবাদসংস্থা এএফপিকে জানান, বাজারে এখন একটি বহুমুখী সংকট তৈরি হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি কমার ইতিবাচক আভাস ছিল, কিন্তু ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই-এর দাম যদি দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে অবস্থান করে, তবে বিশ্বজুড়ে পরিবহন ও শিল্প উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। একই সাথে যুদ্ধ ঝুঁকির কারণে সমুদ্রপথে জাহাজের বিমা খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বাজার অস্থিরতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
ফাইল ছবি সংগৃহীত।


