বাগেরহাট প্রতিনিধি :
বিশ্ব ঐতিহ্য পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জে বর্ডার ও উপকূল রক্ষী বাহিনী কোস্টগার্ডের ধারাবাহিক ও সাঁড়াশি অভিযানের মুখে কোণঠাসা হয়ে অবশেষে আলোর পথে ফিরেছে সুন্দরবনের অন্যতম কুখ্যাত জলদস্যু দল ‘ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী’। বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ ৩টি জেলার মোট ২৭ জন দুর্ধর্ষ বনদস্যু বিপুল পরিমাণ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও শত শত রাউন্ড গোলাবারুদসহ কোস্টগার্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। গত সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) বিকেল ৫টার দিকে বাগেরহাটের শরণখোলা থানাধীন সুন্দরবনের চরপুটিয়া খাল সংলগ্ন এলাকায় এই ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) কোস্টগার্ডের মংলা পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এই চাঞ্চল্যকর ও গৌরবোজ্জ্বল তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।
কোস্টগার্ড সূত্র জানায়, সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুদের হাত থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে জেলে-বাওয়ালীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” এবং “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” নামে দুটি বিশেষ ও যুগান্তকারী অভিযান জোরদার করা হয়। এই সমন্বিত ও কঠোর অভিযানের ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রসহ ৪৫ জন বনদস্যুকে আটক করতে সক্ষম হয় বাহিনীটি। কোস্টগার্ডের এই ত্রিমুখী ও আধুনিক অভিযানের সামনে টিকতে না পেরে এবং জীবন বাঁচানোর তাগিদে অবশেষে দস্যুতার অন্ধকার পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় বনের অপরাধীরা। তার অংশ হিসেবেই এই জাহাঙ্গীর বাহিনী সহ অন্যান্য ছোট-বড় দলের সদস্যরা আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেয়।
আদালত ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় থাকা আত্মসমর্পণকারী ২৭ দস্যুর পরিচয় পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখ (৪৫), মুজাহিদ গাজী (২৭), বিল্লাল শেখ (৩৫), জাহিদ হাসান (২৮), সুমন ঢালী (৩০), এরশাদ শিকারী (৪২), ওয়াহিদুজ্জামান (৩০), আইউব শেখ (৪২), রাফসান ঢালী (৩০), পারভেজ শেখ (২৭), কামরুল শেখ (২৫), জহুরুল গাজী (৩৮), সিরাজুল তরফদার (৩৮) ও আমিনুল ইসলাম (৪০), আসাদুল ইসলাম (৪২), বাবুল শেখ (৪৫), শাজাহান শেখ (৪২), হেলাল (৩৮) খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা ও বটিয়াঘাটা থানার স্থায়ী বাসিন্দা।
বাকিদের মধ্যে আকরাম শেখ (৪৫), নুরুল ইজারদার (৫০), হাসান শেখ (২৭), কামরুল শেখ (২৮), জিয়া শেখ (৩৮), কবির সুলতান (৫৫), কাইয়ুম জমাদ্দার (৪০) ও শরিফুল ইসলাম বয়াতি (২১) বাগেরহাট জেলার রামপাল, ফকিরহাট, কচুয়া, মোড়লগঞ্জ ও শরণখোলা এবং মোঃ জয়নাল আবেদীন (৩৮) পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া থানার বাসিন্দা।
কোস্টগার্ডের আভিযানিক দল জানিয়েছে, আত্মসমর্পণকালে দস্যুরা তাদের জিম্মায় থাকা ৩ টি আধুনিক বিদেশি বন্দুক, ১ টি এইট শুটার, ১ টি ফোর শুটার, ৫ টি দেশীয় একনলা বন্দুক, ১৫ টি দেশীয় পাইপগান, ২ টি চায়না পাইপগানসহ মোট ২৭টি সচল আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেয়। এছাড়াও তাদের কাছ থেকে ৩৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ এবং ৫৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ উদ্ধার করে কোস্টগার্ডের অস্ত্রাগারে জমা রাখা হয়েছে।
এই সফল অভিযানের বিষয়ে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন আরও জানান, “জব্দকৃত বিশাল অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণকারী স্বঘোষিত ডাকাতদের স্থানীয় শরণখোলা থানায় হস্তান্তরের মাধ্যমে পরবর্তী আইনানুগ কার্যব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সরকারের অপরাধ দমন ও পুনর্বাসন নীতি অনুযায়ী তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পুনর্বাসনের বিশেষ ব্যবস্থাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত, নিরাপদ ও পর্যটকদের জন্য অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নিয়মিত টহল, বিশেষ আভিযানিক অ্যাকশন ও সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তৎপরতা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।” ছবি সংগৃহীত।

