নড়াইল প্রতিনিধি :
নড়াইল সদর উপজেলায় চোর সন্দেহে গাছের সঙ্গে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্মম ও বর্বরোচিত নির্যাতনের শিকার এক মানসিক প্রতিবন্ধী যুবক চিকিৎসাধীন অবস্থায় দীর্ঘ এক সপ্তাহ পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ভোর ৫টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। নিহত আনোয়ার হোসেন (৩২) নড়াইল সদর উপজেলার বাঁশগ্রামের কাওছার উদ্দিন মোল্যার ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক প্রতিবন্ধকতায় ভুগছিলেন বলে নিশ্চিত করেছে তাঁর পরিবার।
মামলার এজাহার ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ জুন সকাল ৯টার দিকে আনোয়ার হোসেন ব্যক্তিগত কারণে বাড়ি থেকে বের হন। রাতে তিনি আর বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরদিন ২৫ জুন সকালে নড়াইল সদর হাসপাতালে গিয়ে স্বজনরা জানতে পারেন, আনোয়ার গুরুতর ও রক্তাক্ত অবস্থায় সেখানে ভর্তি রয়েছেন।
অভিযোগে জানা যায়, গত ২৫ জুন রাতে সদর উপজেলার গোবরা মালোপাড়া এলাকায় একটি ভ্যান চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আনোয়ারকে ধরে নিয়ে যায় স্থানীয় একদল উগ্র যুবক। এরপর তাকে গোবরা গ্রামের একটি গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে সারা রাত ধরে লোহার রড ও লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করা হয়। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, নির্যাতন চলাকালে প্রধান অভিযুক্ত প্রসেনজিৎ বিশ্বাস গামছা দিয়ে আনোয়ারের গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যার চেষ্টা চালান এবং অন্য আসামিরা রড দিয়ে পিটিয়ে তাঁর হাত-পা গুঁড়িয়ে দেয়।
২৫ জুন সকালে স্থানীয় এক ইউপি সদস্য বিষয়টি জানতে পেরে নড়াইল সদর থানা পুলিশকে অবহিত করেন। পরে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় আনোয়ারকে উদ্ধার করে প্রথমে নড়াইল সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। পরবর্তীতে তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জরুরি ভিত্তিতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দীর্ঘ এক সপ্তাহ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে গতকাল ভোরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই নির্মম নির্যাতনের ঘটনায় গত ২৯ জুন রাতে নিহতের বড় ভাই নবীর হোসেন বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে নড়াইল সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারনামীয় আসামিরা হলেন— গোবরা মালোপাড়া এলাকার নিভাস বিশ্বাসের ছেলে প্রসেনজিৎ বিশ্বাস, পলান বিশ্বাসের ছেলে সৌরভ বিশ্বাস, অনাধি বিশ্বাসের ছেলে অপূর্ব বিশ্বাস, প্রভাষ বিশ্বাসের ছেলে আকাশ বিশ্বাস এবং পরান বিশ্বাসের ছেলে হৃদয় বিশ্বাস। ঘটনার পর থেকেই তারা সবাই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
নিহতের বড় ভাই নবীর হোসেন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার ভাইটা ছিল মানসিক প্রতিবন্ধী। ও প্রায়ই না বুঝে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াত। ও কোনো চোর নয়। শুধু শুধু চোর অপবাদ দিয়ে পশুর মতো পিটিয়ে আমার ভাইকে ওরা মেরে ফেলল। আমি খুনিদের ফাঁসি চাই।”
নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অজয় কুমার কুন্ডু ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, “মানসিক প্রতিবন্ধী যুবক আনোয়ারের মৃত্যুর পর পূর্বে দায়েরকৃত নির্যাতন ও দমন মামলাটি এখন নিয়মিত ‘হত্যা মামলা’ (দণ্ডবিধি ৩০২ ধারা) হিসেবে রূপান্তর করা হবে। আসামিরা বর্তমানে পলাতক থাকলেও তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পুলিশের বিশেষ টিম ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) মাঠে নেমেছে। অপরাধী যারাই হোক না কেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।”ফাইল ছবি সংগৃহীত।

