স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এক মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার দেনায়েতপুর এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে মা ও তিন বোনসহ একই পরিবারের চারজনকে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে এক ঘাতক। এদিকে ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়দের গণপিটুনিতে অভিযুক্ত ঘাতকও নিহত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে।
নিহতরা হলেন— শাহিনুর বেগম (৩৮), তাঁর বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। অপরদিকে গণপিটুনিতে নিহত ঘাতকের নাম অন্তর মজুমদার (২৮)। তিনি নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকার কার্তিক মজুমদারের ছেলে এবং রায়পুর বাজারের একজন ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসায়ী ছিলেন।
এই নৃশংস ঘটনার পর পুরো পরিবারে এখন একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে অবশিষ্ট রইল আঠারো বছর বয়সী জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। সিফাত রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালে বৃষ্টিতে ভিজে গ্রামে হাড়ি-পাতিল বিক্রি করার সময় বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যান সিফাতের হকার বাবা কামাল হোসেন। বাবার মৃত্যুর পর মা ও তিন বোনই ছিল সিফাতের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নিজের পড়ালেখা ও পরিবারের খরচ চালাতে সিফাত রায়পুর বাজারের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আট হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন। গতকাল সকালেও তিনি বাসা থেকে কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। কাজ থেকে ফিরে মা ও বোনদের রক্তাক্ত মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। হাউমাউ করে কেঁদে সিফাত প্রশ্ন করেন, “আমার মা-বোনদের কী অপরাধ ছিল? কেন তাদের এভাবে মারা হলো? দুনিয়াতে তো এখন আমার আর কেউ রইল না।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত কামাল হোসেনের মূল বাড়ি কুমিল্লার হোমনায় হলেও জীবিকার তাগিদে ১০-১২ বছর আগে তিনি সপরিবারে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে আসেন। সন্তানদের ভালো মানুষ করার জন্য তিনি দিনরাত পরিশ্রম করতেন। তাঁর মৃত্যুর পরও পরিবারটি কষ্ট করে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিল। সিফাতের বন্ধুরা জানান, ভাই-বোন সবাই খুব মেধাবী ছিল এবং কুমিল্লাতেও তাদের আপন বলতে কেউ নেই। রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, সিফাত তাদের প্রতিষ্ঠানে সাত-আট মাস আগে যোগ দেয়। সবার সহযোগিতায় পরিবারটি বেশ ভালোভাবেই চলছিল।
এদিকে ঘটনার পর দুপুরে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি প্রত্যক্ষদর্শী, বাড়ির মালিক ও আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। পুলিশ সুপার জানান, ঘাতক অন্তর তাঁর স্ত্রীসহ প্রায় দেড় বছর ওই বাড়িতেই ভাড়া থাকতেন। সাত-আট মাস আগে তিনি বাসা ছেড়ে চলে যান। পূর্বপরিচিত হওয়ার সুবাদে গতকাল সকালে অন্তর ওই বাসায় আসেন। রাণী নামের এক প্রতিবেশী অন্তরকে ওই বাসায় ঢুকতে দেখে কারণ জানতে চাইলে অন্তর জানান, তিনি পানির পাইপ ঠিক করতে এসেছেন। তবে ওই নারীর মনে সন্দেহ হলে তিনি কৌশলে বাইরের কলাপসিবল গেট আটকে দিয়ে স্থানীয় লোকজনকে খবর দেন। স্থানীয়রা এগিয়ে এলে ঘরের ভেতর চারজনের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পায় এবং পালিয়ে যাওয়ার সময় অন্তরকে ধরে গণপিটুনি দেয়। ছবি সংগৃহীত।

