স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ায় গত এক সপ্তাহে একাধিক বিদ্যালয়ে ধারাবাহিক জঙ্গি হামলা ও গণ-অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় অন্তত ৮০টিরও বেশি কোমলমতি শিশু নিখোঁজ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
সরকার জিহাদি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান চালালেও, সাম্প্রতিক এই হামলাগুলো স্কুলশিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তীব্র উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
সোমবার (১৮ মে) রাজধানী আবুজা থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর পাঠানো প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দেওয়া তথ্যে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবার ও বৃহস্পতিবারের মধ্যে নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বোর্নো অঙ্গরাজ্যের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম হামলাটি চালায় সশস্ত্র গোষ্ঠী। বোর্নোর আসকিরা উবা ও চিবক এলাকায় অবস্থিত ওই স্কুল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ৪২টি শিশুকে অপহরণ করা হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, বোর্নো রাজ্যের কুখ্যাত ‘সাম্বিসা বনাঞ্চল’ সংলগ্ন মুসা গ্রামে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এই বনটি দীর্ঘ দিন ধরে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী বোকো হারাম ও ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট ‘আইএসডব্লিউএপি’ (ISWAP)-এর প্রধান শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
এর ঠিক কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে, গত শুক্রবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ওয়ো অঙ্গরাজ্যের দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও অতর্কিত হামলা চালায় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত আরেকটি গোষ্ঠী। অ্যামনেস্টির নাইজেরিয়া শাখা জানিয়েছে, ওয়ো অঙ্গরাজ্যের ওরিইরে এলাকার স্কুল দুটি থেকে অন্তত ৪০ শিশুকে অপহরণ করা হয়েছে, যা ওই অঞ্চলের শান্ত পরিবেশকে আকস্মিক স্তব্ধ করে দিয়েছে। তবে মুসা গ্রামের সরকারি কর্মকর্তা পিটার ওয়াব্বা দাবি করেছেন, ওয়ো রাজ্যে অপহৃত শিশুর প্রকৃত সংখ্যা ৪৮ জন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, ক্রমাগত অপহরণের আতঙ্কে হাজার হাজার শিশু স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে, অনেক পরিবার তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে শিশুদের সম্ভাব্য জঙ্গি হামলা ও ধর্ষণ থেকে বাঁচাতে স্কুল থেকে নাম কাটিয়ে দিচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত, নিরাপত্তার অজুহাতে এসব মেয়ে শিশুদের পরিবার অত্যন্ত কম বয়সে বাল্যবিয়েতে বাধ্য করছে, যা দেশটির নারী শিক্ষার ওপর এক চরম আঘাত।
মুসা গ্রামের সরকারি কর্মকর্তা পিটার ওয়াব্বা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার আমাদের বারবার আশ্বাস দিচ্ছে যে তারা অপহৃত শিশুদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু দিনের পর দিন কেটে গেলেও আমরা কেবল অপেক্ষাই করে যাচ্ছি, কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।”
এদিকে অ্যামনেস্টি অভিযোগ করেছে, নাইজেরিয়ার কর্তৃপক্ষ প্রায়ই এই ধরণের ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর তদন্ত ও দোষীদের বিচারের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটে না। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে।
ওয়ো রাজ্যের পুলিশ মুখপাত্র আয়ানলাদে ওলায়িঙ্কা শনিবার জানিয়েছেন, ওরিইরে এলাকার স্কুলে হামলার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় ইতিমধ্যে ৩ জন সশস্ত্র বন্দুকধারীকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে এই চক্রের সাথে আর কারা জড়িত বা শিশুরা বর্তমানে কোথায় আছে, সে বিষয়ে কৌশলগত কারণে পুলিশ বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
উল্লেখ্য, আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল দেশ নাইজেরিয়ায়, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে স্কুল থেকে শিশুদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় একটি নিয়মিত সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরও দেশটির দুটি বড় স্কুল থেকে একযোগে ৩ শতাধিক শিশুকে অপহরণ করেছিল জঙ্গিরা। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ আকর্ষণ এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো স্কুলগুলোকে তাদের প্রধান সফট-টার্গেট বা কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করছে।
সূত্র-আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।


