“আমি নাকি কেউ না!”-কোটচাঁদপুরে এক নির্যাতিত কলম সৈনিকের বিচারহীনতার হাহাকার

“আমি নাকি কেউ না!”-কোটচাঁদপুরে এক নির্যাতিত কলম সৈনিকের বিচারহীনতার হাহাকার

স্টাফ রিপোর্টার, ঝিনাইদহ (কোটচাঁদপুর):
বিগত ১৪টি বছর। কারো কাছে এটি কেবলই ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো সময়, কিন্তু কোটচাঁদপুরের সিনিয়র সাংবাদিক রফিক মন্ডলের কাছে এটি ছিল এক জীবন্ত জাহান্নাম। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মিথ্যা অপবাদ আর ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে একটি সম্মানীত পরিবারকে তিল তিল করে ধ্বংস করার যে নীল নকশা করা হয়েছিল, আজ তার বিস্ফোরণ ঘটেছে রফিক মন্ডলের কলমে। ক্ষোভ আর যন্ত্রণায় তিনি আজ প্রশ্ন তুলেছেন— “আমি নাকি কেউ না!”

ফেরারি জীবনের সেই ভয়াল স্মৃতি:
রফিক মন্ডল আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছর তাকে দাগি আসামির মতো ফেরারি হয়ে পথে পথে ঘুরতে হয়েছে। নিজ দেশে চোর-পুলিশ খেলায় মেতেছিল প্রশাসন। র‍্যাব-৬ ঝিনাইদহের খাঁচায় বন্দি হওয়া থেকে শুরু করে বারবার ঝিনাইদহ জেলা কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটাতে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে ২০১২ এবং ২০১৮ সাল ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় সময়। বাড়িঘর তছনছ করেছে পুলিশ, প্রিয় মেয়ের বিয়েতে পর্যন্ত উপস্থিত থাকার অধিকার পাননি এই বাবা।

জীবন বাঁচাতে যখন সর্বস্বান্ত:
সাংবাদিকতা ও শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় থেকেও তাকে টাকার বিনিময়ে চাকরি বাঁচাতে হয়েছে। মাসের পর মাস বেতন কর্তন করা হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “কোটচাঁদপুর পৌর শহরের দুধসারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নির্বাচনে ১১ ভোটের মধ্যে ৯ ভোট পেয়েও আমি দায়িত্ব নিতে পারিনি। কারণ, তৎকালীন প্রভাবশালী ‘প্রিয় দাদাভাইরা’ আমার নামে জঙ্গিবাদের তকমা লাগিয়ে অভিযোগ দিয়েছিল। তখন সভাপতি হওয়া নয়, জীবন আর চাকরি বাঁচানোই ছিল আমার বড় চ্যালেঞ্জ।”

অর্ধাঙ্গিনীর চোখে কারান্তরালের অশ্রু:
নিপীড়ন শুধু রফিক মন্ডলের ওপরই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তার স্ত্রী মোছা. নাজমা খাতুনকেও রেহাই দেয়নি তৎকালীন ক্ষমতাবানরা। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের নামে ‘জঙ্গি’ তকমা লাগিয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। নাজমা খাতুনকে ৪টি মিথ্যা মামলায় টানা ৪৯ দিন জেল খাটতে হয়েছে। রফিক মন্ডল প্রশ্ন করেন, একটি পরিবারের ওপর এমন অমানবিক নির্যাতনের বিচার কি এই মর্ত্যে নেই?

‘কেউ না’ হয়ে থাকার একাকীত্ব:
কঠিন সময়ে যাদের পাশে পাওয়ার কথা ছিল, সেই দলের অনেক নেতাকর্মীও তখন ফোন ধরার সাহস পাননি। অথচ আজ যখন সুসময়, তখন চারদিকে ‘ত্যাগী’ নেতাদের ছড়াছড়ি। রফিক মন্ডল আক্ষেপ করে বলেন, “২০ বছরের সব অঘটনের সাক্ষী আমার প্রিয় নেতা। আজ যখন বীরদর্পে পদ-পদবি ব্যবহার করে চরিত্র হনন করা হচ্ছে, তখন শুনতে হয়—আমি নাকি কেউ না!”

বিচার সঁপেছেন খোদার আদালতে:
হাতে সমস্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও রফিক মন্ডল আজ চুপ। তিনি পরকালের পুরস্কারের আশায় সব কিছু ধামাচাপা দিয়েছেন। তার শেষ কথাগুলো ছিল চোখে পানি আসার মতো— “সবকিছুর সাক্ষী মাওলা তুমি। তোমার ইজ্জতের কসম, সব অভিযোগ তোমার সমীপে সঁপে দিলাম। কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে তুমিই আমার অভিভাবক। সেদিন সব সত্য প্রকাশ করে আমার মনটাকে ভরিয়ে দিও।”

ছবিতে আদালতের বারান্দায় ও কাঠগড়ায় সাংবাদিক রফিক মন্ডল।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *