স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
জামালপুর জেলায় মাত্র ১০ হাজার টাকার জরুরি প্রয়োজনে একটি অটোরিকশা (মিশুক) ছিনতাই ও চুরির লোভাতুর পরিকল্পনা থেকে নায়েব আলী নামে এক নিরীহ চালককে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার ক্লু-লেস মামলার রহস্য মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে উন্মোচন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন । পিবিআই জামালপুর জেলা ইউনিট তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড মোঃ নাহিদুল ইসলাম (৩০) সহ চোরাই মাল কেনাবেচা ও পরিবহনে জড়িত সর্বমোট ০৬ অপরাধীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে। একই সাথে নিহতের লাশ গুম করার কাজে ব্যবহৃত লাগেজ, হত্যার জিআই তার এবং কেটে টুকরো টুকরো করা অটোরিকশার বডিসহ বিপুল পরিমাণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
পিবিআই জামালপুর জেলা ও মামলার নথির বিবরণ অনুযায়ী, মেলান্দহ এলাকার বাসিন্দা ও মিশুক চালক নায়েব আলী প্রতিদিনের ন্যায় গত ২১ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ রবিবার ভোর ৪:০০ ঘটিকার সময় ঢাকার কমিউটার ট্রেনের নিয়মিত যাত্রীদের স্থানীয় স্টেশনে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর মিশুক অটোরিকশাটি নিয়ে বাড়ি হতে বের হন। অন্যান্য দিন ডিউটি শেষে যথাসময়ে বাড়ি ফিরলেও ওইদিন রাত গড়িয়ে গেলেও তিনি আর ফেরেননি। চারদিকে খোঁজাখুঁজি করে বাপের সন্ধান না পেয়ে তাঁর ছেলে মোঃ মামুন ওরফে মমিন মেলান্দহ থানায় একটি নিখোঁজ সাধারণ ডায়েরি করেন এবং নিরূপায় হয়ে বাবার ছবি দিয়ে ফেসবুকে একটি নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি পোস্ট করেন।
এদিকে নায়েব আলী নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ইসলামপুর থানাধীন চরপুটিমারী ইউনিয়নের অন্তর্গত বেনিয়ারচর বাজার হতে আনুমানিক ০১ কিলোমিটার দূরে এক নির্জন গভীর ধানক্ষেতের মাঝখানে একটি সন্দেহভাজন বড় লাগেজ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় কৃষকেরা। খবর পেয়ে পুলিশ এসে লাগেজটি খুললে তার ভেতর থেকে আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতনামা পুরুষের হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করে। নিখোঁজের ফেসবুক পোস্ট দেখে এক ব্যক্তি নায়েব আলীর পরিবারকে এই লাশের খবর দিলে তাঁর ভাই হাফিজুর রহমান ও ছেলেরা ইসলামপুর থানায় গিয়ে লাশটি চালক নায়েব আলীর বলে শনাক্ত করেন। এই ঘটনায় ভিকটিমের ছেলে মোঃ মামুন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ইসলামপুর থানায় মামলা নং-২৫ (তারিখ: ২৪/০৬/২০২৬), ধারা-৩০২/২০১/৩৭৯ পেনাল কোড দায়ের করেন।
মামলাটি দায়েরের পর পরই পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে জামালপুর জেলা পিবিআই স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে এবং মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয় দক্ষ সাব-ইন্সপেক্টর ফয়জুর রহমানের ওপর।
তদন্তকারী কর্মকর্তা তথ্য-প্রযুক্তির নিখুঁত ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ২৪ জুন গভীর রাত ৩:৩০ ঘটিকায় মেলান্দহ থানাধীন চাকদহ সর্দারবাড়ী গ্রামের নিজ ডেরা থেকে মূল ঘাতক মোঃ নাহিদুল ইসলামকে (৩০) গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর পরই নাহিদুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুরু হয় চোরাই মাল উদ্ধারের দ্বিতীয় দফার অভিযান।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঘাতক নাহিদুলের জরুরি ভিত্তিতে মাত্র ১০,০০০/- (দশ হাজার) টাকার তীব্র প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। সেই টাকা জোগাড় করতে কোনো উপায় না পেয়ে সে নিরীহ চালক নায়েব আলীর অটোরিকশাটি চুরি ও ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে। ঘটনার দিন ভোরে নায়েব আলীকে নির্জন স্থানে নিয়ে সুকৌশলে জিআই তার দিয়ে গলা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশটি লাগেজে ভরে ধানক্ষেতে ফেলে দেয় সে।
পরবর্তীতে মিশুক অটোরিকশাটি চুরির মালামাল জানা সত্ত্বেও অভ্যাসগতভাবে তা কম দামে স্ক্র্যাপ হিসেবে কিনে নেয় একদল অসাধু চক্র। পিবিআই নাহিদুলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে চোরাই মালামালের মূল ক্রেতা মোঃ সোলাইমান কবির (৫০), মোঃ শফিকুল ইসলাম (৪১), মোঃ আব্দুল কাদের (৫৬), মোঃ রাসেল হোসেন (৩৪) এবং চোরাই বডি ও ব্যাটারি পিকআপে করে পরিবহনে সরাসরি সহায়তাকারী সাগর পাশা (২৬) কে গ্রেফতার করে।
অভিযানে আসামিদের হেফাজত থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মূল ক্ষতিকর জিআই তার, চোরাই মিশুক অটোরিকশার ০৪টি দামী ব্যাটারি, ০১টি কন্ট্রোলার, ০৩টি চাকা, মোটর ডিফারেন্সিয়াল, ০২টি সকেট বাম্পার, সামনের উইন্ডশিল্ড গ্লাসসহ লোহার বডির বিভিন্ন ধারালো করাত দিয়ে কাটা অংশ বিশেষ উদ্ধারপূর্বক বিধি মোতাবেক জব্দ করা হয়।
গ্রেফতারকৃত মূল খুনি মোঃ নাহিদুল ইসলামকে আজ ২৫ জুন (বৃহস্পতিবার) দুপুরে কড়া পুলিশি পাহারায় জামালপুরের বিজ্ঞ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হলে, সে বিজ্ঞ বিচারকের খাসকামরায় স্বেচ্ছায় সিআরপিসির ১৬৪ ধারা মোতাবেক নিজের জঘন্য অপরাধ স্বীকার করে এবং হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। বিজ্ঞ আদালত জবানবন্দি রেকর্ড শেষে মূল আসামিসহ সকলকে জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এই ক্লু-লেস মার্ডার কেসটি মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে ডিটেক্ট করায় পিবিআই-এর চৌকস টিমকে সাধুবাদ জানিয়েছে জামালপুরের সাধারণ মানুষ।ছবি সংগৃহীত।


