রফিক মন্ডল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) | ২০ মার্চ ২০২৬
আদর্শের নেশায় যে মানুষটি একদিন রাজপথ কাঁপাতেন, দলের প্রয়োজনে বুক পেতে দিতেন যেকোনো লড়াইয়ে, আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই মানুষটির পৃথিবী থমকে গেছে চার দেয়ালের অন্ধকার কোণে। তিনি কোটচাঁদপুর উপজেলার ফুলবাড়ি সমাজকল্যাণ পাড়ার ইউনুচ আলীর ছেলে মো. ইন্তাজুল ইসলাম। এক সময় যিনি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কোটচাঁদপুর অঞ্চলের এক নির্ভীক ও ‘জানবাজ’ কর্মী, আজ অভাব আর পঙ্গুত্বের অভিশাপে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য হামলা ও চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষী ইন্তাজুল। বারবার কারাবরণ আর বিগত শাসনামলে পুলিশের অমানুষিক নির্যাতনের ক্ষত শরীরে বয়েও তিনি ছিলেন আদর্শে অবিচল। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় একটি দুর্ঘটনা ওলটপালট করে দিয়েছে তার জীবনের সব সমীকরণ। আলমসাধু থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি শয্যাশায়ী। অর্থাভাবে থমকে গেছে চিকিৎসা, ঘরে নেই দুবেলা দুমুঠো অন্নের নিশ্চয়তা। আসন্ন ঈদে সন্তানদের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানোর মতো ন্যূনতম সামর্থ্যও আজ হারিয়ে ফেলেছেন এই নিঃস্ব বাবা।
বিছানায় শুয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠা ইন্তাজুল আজ সমাজের চরম বৈষম্য দেখছেন খুব কাছ থেকে। বুকভরা ক্ষোভ আর অভিমানে তিনি বলেন:
“আজ নিজের চোখে দেখছি ঈদ উপলক্ষে সরকারি অনুদান আর দলের পক্ষ থেকে ঘরে ঘরে সহায়তা পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু আমার ভাঙা দুয়ারে কেউ আসেনি। তবে কি আমি শুধুই ব্যবহারের বস্তু ছিলাম? প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে কি কর্মীর কোনো মূল্য থাকে না?”
বর্তমানে যারা রাজনীতিতে সক্রিয়, তাদের উদ্দেশ্যে এক দীর্ঘশ্বাসের বার্তা দিয়েছেন এই ত্যাগী কর্মী। ইন্তাজুল বলেন:
“আজ আমি জীবনের এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত জ্যান্ত প্রমাণ। যারা রাজনীতি করছেন, তারা আমার দিকে তাকিয়ে শিক্ষা নিন। সুদিনে আপনার চারপাশে হাজারো মানুষের ভিড় থাকবে, কিন্তু একটি দুর্ঘটনা বা দুর্দিন ঘনিয়ে এলে ছায়ার মতো সবাই উধাও হয়ে যায়। এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় শেষ পর্যন্ত পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকেই পাওয়া যায় না।”
এক সময়ের রাজপথ কাঁপানো এই লড়াকু সৈনিকের বর্তমান অবস্থা যেন রাজনীতির এক অন্ধকার পিঠকেই উন্মোচিত করছে। যেখানে নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা নিক্ষিপ্ত হন বিস্মৃতির অতলে, আর উৎসবের আলোয় আলোকিত হয় শুধু প্রভাবশালীদের আঙিনা। ইন্তাজুলের এই নীরব কান্না কি পৌঁছাবে সংশ্লিষ্টদের কানে? নাকি রাজনীতির এই নিষ্ঠুর আবর্তে এভাবেই হারিয়ে যাবে আরও হাজারো ইন্তাজুলের স্বপ্ন আর আত্মত্যাগ?


