
ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি : বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এখন আর কেবল বাঘের আতঙ্কে নয়, বরং বনদস্যু ও শোষক মহাজনদের এক অলিখিত ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। বনের গহিনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবন চালানো হাজার হাজার বনজীবীর নিরাপত্তা এখন নির্ভর করছে পকেটে থাকা একটি ‘পাঁচ টাকার নোটের’ ওপর। দস্যুদের দেওয়া বিশেষ নম্বরের এই নোটই এখন সুন্দরবনে টিকে থাকার একমাত্র রক্ষাকবচ বা নিরাপত্তা টোকেন।
টোকেন বাণিজ্যের অন্তরালে
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বনজীবীরা মহাজনদের মাধ্যমে দস্যুদের নির্ধারিত চাঁদা পরিশোধ করে একটি পাঁচ টাকার নোট সংগ্রহ করেন। বনের ভেতর দস্যুরা নৌকা থামিয়ে ওই নোটের নম্বর তাদের তালিকার সঙ্গে মেলালেই মেলে মুক্তি। অন্যথায় কপালে জোটে অমানুষিক নির্যাতন কিংবা অপহরণ। একেকটি ‘গণ’ বা মাছ ধরার সিজনে জেলেদের গুনতে হচ্ছে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। অথচ ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে ঘটা করে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল।
পটপরিবর্তন ও দস্যুরাজত্বের প্রত্যাবর্তন
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুন্দরবনে দস্যুদের তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্ট থানা থেকে লুণ্ঠিত আধুনিক চাইনিজ রাইফেল ও নাইন এমএম পিস্তল এখন দস্যু বাহিনীর হাতে। মজনু বাহিনী কিংবা নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়া ‘আলিফ ওরফে দয়াল বাহিনী’ এখন বনের গহিন নিয়ন্ত্রণ করছে। জেলেরা বলছেন, প্রশাসনের অভিযানের খবর দস্যুরা আগেই পেয়ে যায় বন বিভাগের ভেতর থাকা কিছু অসাধু দালাল ও ‘সোর্স’-এর মাধ্যমে।
মহাজনী ঋণের মরণফাঁদ
বনের ভেতরে দস্যুদের আতঙ্ক আর বাইরে মহাজনদের ঋণের বোঝা—এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট প্রান্তিক জেলেরা। দস্যুদের চাঁদা দিতে জেলেরা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নেন। একবার এই ঋণের জালে আটকা পড়লে তারা মূলত ওই মহাজন বা ‘কোম্পানি’র দাসে পরিণত হন। তখন সংগৃহীত মাছ বা কাঁকড়া বাজারের দামে বিক্রির সুযোগ থাকে না; মহাজনের নির্ধারিত নামমাত্র দামেই তা তুলে দিতে হয়। ঋণের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে বছরের পর বছর কাজ করেও দিনমজুর থেকে যান এই বনজীবীরা।
দালাল সিন্ডিকেট ও প্রশাসনিক শূন্যতা
অভিযোগ উঠেছে, সাতক্ষীরা রেঞ্জের বন অফিসগুলোর চারপাশে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র সক্রিয়। জেলেরা যখন বৈধভাবে মাছ ধরার ‘পাস’ সংগ্রহ করতে যান, সেই তথ্য দালালদের মাধ্যমে পৌঁছে যায় দস্যুদের হাতে। ফলে বনের কোথায় কোন জেলে অবস্থান করছেন, তা দস্যুদের নখদর্পণে থাকে। এমনকি যারা দস্যুদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন, তাদের নাম ওঠে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কালো তালিকায়। প্রাণের ভয়ে অনেক জেলে এখন বনে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন, পরিবার নিয়ে কাটছে অনাহারে।
মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা
মানবাধিকারকর্মীরা এই পরিস্থিতিকে একটি বড় ধরণের ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে দেখছেন। বন বিভাগ ও নৌ-পুলিশ নিয়মিত টহলের দাবি করলেও মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। কোস্টগার্ডের অভিযানে গত এক বছরে বেশ কিছু দস্যু আটক ও অস্ত্র উদ্ধার হলেও সিন্ডিকেটটি সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হয়নি।
সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ করে রাষ্ট্রকে রাজস্ব দিলেও, এই বনজীবীদের জীবনের নিরাপত্তা যেন আজ কেবল একটি ‘পাঁচ টাকার নোটের’ কাছে জিম্মি।
ছবি-সংগৃহীত


